শাবান মাস এসেছে, রমজানের প্রস্তুতি শুরু করুন

শুরু হয়েছে শাবান মাস। আর ক’দিন পরই রহমত, বরকত, মাগফিরাতের মাস রমজান সমাগত। এই মহান মাসের যথাযোগ্য মর্যাদা দান ও এর থেকে পূর্ণাঙ্গ ফায়দা অর্জনের জন্য চাই যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি। রাসূলুল্লাহ সা. রজব মাসের শুরু থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন এবং সাহাবাদেরও এর নির্দেশ দিতেন। সালাফে সালেহীনের জীবনে পাওয়া যায় যে, তারা বছরের প্রথম ছয় মাস রমজানের প্রস্তুতি নিতেন, আর বাকি ছয় মাস আমল কবুলের দোয়া করতেন। সঠিক অর্থে রমজানের প্রস্তুতি আমরা কিভাবে নিতে পারি সেই সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করার চেষ্টা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

ব্যক্তিগত প্রস্তুতি
১. সজাগ সতর্ক হওয়াঃ শাবানের আগে ও পরে দু’টি মহিমান্বিত মাস (রজব ও রমজান) থাকায় অনেক সময় শাবানের ব্যাপারে ঔদাসিন্য দেখা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘শাবান মাস সম্পর্কে মানুষ উদাসিন’। তাই শাবান মাসের আমলসমূহের ব্যাপারে অবহেলা না করে আরো বেশি সজাগ সতর্ক ও যত্নবান হওয়া উচিত।

২. তাওবা ও ইস্তেগফারঃ রমজান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও জান্নাত লাভের মাস। তাই এই মাস আসার পূর্বে সকল প্রকার গুনাহ থেকে পবিত্র হওয়া জরুরি। কারণ গুনাহের আধিক্য আমলের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করে। ইমাম ফুযাইল রহঃ বলেন, ‘যদি তুমি দিনে রোজা রাখতে ও রাতে কিয়াম করতে না পারো তবে ধরে নাও বন্দি; তোমার গুনাহ তোমাকে আবদ্ধ করে রেখেছে’।

বিশেষত বান্দার হক্ব সম্পর্কিত কোন বিষয় থাকলে রমজান আসার পূর্বেই তা মিটিয়ে ফেলা জরুরি। হাদিসে এসেছেঃ ‘আল্লাহ্‌ তায়ালা মধ্য শাবানের রাতে ( শবে বরাত) বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিবাদকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করেন’।

৩. দোয়া করাঃ ক্ষণস্থায়ী এই জীবনের প্রদীপ যেকোন সময় নিভে যেতে পারে, তাই রমজানপ্রাপ্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, রাসুলুল্লাহ সাঃ রজব মাস আসলে এই দোয়া পড়তেনঃ ‘ আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রাজাবা ওয়া শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’ ( অর্থঃ হে আল্লাহঃ আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের (জীবনে) বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌছে দিন)।

৪. কাজের ব্যস্ততা কমিয়ে ফেলাঃ রমজান আসলেই বিভিন্ন পেশার মানুষ তাদের দুনিয়াবী কাজকর্মে প্রচুর ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এই ব্যস্ততার দরুন অনেক সময় বিভিন্ন ফরযও ছুটে যায়। অথচ এটি সালাফে সালেহীনের সম্পূর্ণ বিপরীত পথ। তাই এখন থেকেই কাজের রুটিন করে ব্যস্ততা কমিয়ে আনা জরুরি। ইমাম আমর ইবনুল কাইস রাহঃ শাবান মাস শুরু হলে দোকান – ব্যবসা বন্ধ করে কুরআন তেলাওয়াতে মগ্ন হতেন।

শাবান মাসের আমলসমূহ
শাবান মাসে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সর্বাধিক পছন্দনীয় আমল ছিল রোজা রাখা। হযরত উসামা ইবনে যায়েদ রাঃ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসুলুল্লাহ ! শাবান মাসে আপনি যে পরিমাণ রোজা রাখেন অন্য মাসে তেমন রাখতে দেখিনা। তিনি ইরশাদ করলেনঃ ‘শাবান হলো রজব ও রমজানের মাঝের মাস, যার ব্যাপারে মানুষ উদাসীন থাকে। এই মাসে মানুষের আমলসমূহ আল্লাহর নিকট যায়, তাই আমি চাই যে রোহা অবস্থায় আমার আমল আল্লাহর নিকট পৌঁছুক’ (নাসায়ী)।

এজন্য রমজানের পূর্বপ্রস্তুতি স্বরূপ শাবানের বেশির ভাগ বা না পারলে কমপক্ষে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা উচিত। এছাড়াও কুরআন তেলাওয়াত, যিকির–ইস্তেগফার অধিকহারে করার অনুশীলন করা।

৫. ফাযায়েল – মাসায়েলের ইলম অর্জন করাঃ কোন কাজের মর্যাদা ও লাভ জানা থাকলে সেই কাজের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এজন্য নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থ থেকে রমজানের বিভিন্ন আমলের ফযিলত বারবার পাঠ করা উচিত। পাশাপাশি রোজা, তারাবী, সেহরী – ইফতার, যাকাত – সাদকা সহ অন্যান্য বিষয়ের প্রয়োজনীয় আহকাম ও মাসায়েল জানা আবশ্যক। এজন্য এখন থেকেই অভিজ্ঞ আলেম – মুফতির তত্বাবধানে ‘ফিকহুস সিয়াম’ শিক্ষা শুরু করা যেতে পারে।

পারিবারিক প্রস্তুতি
১. রমজানের গুরুত্ব শেখানোঃ রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে ( কেয়ামতের দিন ) জিজ্ঞাসিত হবে’”। একজন পরিবারের কর্তাব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের আর্থিক – সামাজিক উন্নতির সাথে সাথে ধর্মীয় অগ্রগতিরও দায়িত্বশীল। তাই পরিবারের ছোটবড় সকলকে রমজানের আগেই এর গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় মাসায়েল শেখানো আবশ্যক। পাশাপাশি আমলের তদারকি করা ও সাংসারিক ব্যস্ততায় যেন কোন আমলে ঘাটতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

২. ভাংতি রোজা ক্বাযা করাঃ শরয়ী ওযরের কারণে রমজান মাসে রোজা ভাঙ্গার অনুমতি রয়েছে। এখানে শরয়ী ওযর বলতে মারাত্মক অসুস্থতা, মাসিক ঋতুস্রাব, প্রসবকালীন স্রাব ও সফরজনিত কারণকে বুঝানো হয়েছে। অনেককে এই ভাংতি রোজাগুলো ক্বাযা করতে অলসতা দেখা যায়। হযরত আয়েশা রাঃ বলেনঃ ‘রমজান মাসে আমার যে রোজাগুলো ছুটে যেত পরবর্তী শাবান মাসের মধ্যেই আমি তা ক্বাযা করে ফেলতাম’ ( বুখারী)।
তাই যাদের ভাংতি রোযা রয়েছে এখনো রমজান আসার পূর্বেই সেগুলো ক্বাযা করে ফেলা উচিত।

৩. সাংসারিক রুটিন ও কর্মবণ্টনঃ রমজান মাসে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমানভাবে ইবাদত – বন্দেগিতে লিপ্ত হওয়া উচিত। মহিলা সাহাবী, তাবেয়ীদের জীবনীতে এমনি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে সাংসারিক ব্যস্ততার দরুন অনেক নারীই পর্যাপ্ত ইবাদতের সময় বের করতে পারেন না। এমনকি অনেকের তারাবীর বিশ রাকাত বা কুরআনের খতমও পুরা হয় না। তাই এখন থেকেই দৈনন্দিন রুটিন বানিয়ে পারস্পারিক সহযোগিতা ও কর্মবণ্টনের মাধ্যমে কাজ সহয করে নেয়া দরকার। এর সাথে রমজানের প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও আগেভাগে সেরে ফেলা উচিত, যাতে এজন্য কোন পবিত্র রজনী নষ্ট না হয়।

বাসাবাড়ীর কাজের লোক ও কর্মক্ষেত্রের কর্মকর্তা – কর্মচারীর ক্ষেত্রেও একই কথা। দায়িত্বের চাপে যেন তাদের রোজার কোন ক্ষতি না হয় সেদিকেও যত্নবান থাকা প্রয়োজন।

সামাজিক প্রস্তুতি
রমজানকে স্বাগত জানিয়ে নানা আয়োজন হয়ে থাকে আমাদের দেশে। রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনগুলো পোস্টার–লিফলেট ছাপায়। দ্রব্যমূল্য কমানো, অশ্লীলতারোধ সহ বিভিন্ন দাবী ও পয়গাম থাকে সেইসব পোস্টারে…! অনেকে বুকে সাদা পোশাকে ‘ স্বা গ ত ম মা হে র ম জা ন’ লিখে রাস্তায় র‍্যালি বের করে। কখনো এসব র‍্যালি ব্যস্ত নগরীর প্রচণ্ড জ্যামে অতিষ্ঠ জনগণের ভোগান্তি আরও কিছুক্ষণ বাড়িয়ে দেয়।

আসলে কী উপায়ে রমজানকে স্বাগত জানানো উচিত আমাদের?

১. দাওয়াতি কর্মসূচিঃ মুসলিম প্রধান দেশ হলেও দুঃখজনক সত্য এই যে, দেশের অনেক মানুষ রমজানের রোজা রাখে না। এতে কিশোর – যুবকের পাশাপাশি শারীরিক শ্রম দিয়ে খেটেখাওয়া মানুষদের ( রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, লেবার, হেলপার) সংখ্যাই বেশি। দ্বীন বিষয়ে অজ্ঞতা ও কাজের অজুহাতে তারা রোজা রাখে না। এসকল মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের রোজা – নামাযের গুরুত্ব শেখানো আবশ্যকীয় কর্তব্য। দাওয়াতের সার্বজনীন কর্মসূচীর মাধ্যমে এখন থেকেই তা শুরু করা উচিত।

২. সামাজিক কর্মসূচিঃ বরকত ও প্রাচুর্যের মাস রমজানকে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী মহল বিভীষিকাময় করে তোলে। তাদের মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা লোভের শিকার সাধারণ রোজাদার মুসলমান। অন্যদিকে রাস্তার মোড়ে বা বস্তির কোনায় দিনের বেলা যারা কাপড় টানিয়ে হোটেল চালানোর প্রস্তুতি শুরু হয় শবে বরাতের পর থেকেই।

রমজানকে স্বাগত জানিয়ে একদিনের র‍্যালি–মিছিলের পরিবর্তে এখন থেকেই এসব অনৈতিকতা রোধে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক – সামাজিক সংগঠনসহ সবশ্রেণীর দ্বীনদার মুসলমানদের এতে অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

শেষ কথা
হাদিসে এসেছেঃ ‘বছরের নির্দিষ্ট কিছুদিন তোমাদের জন্য তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে বিশেষ উপহার রয়েছে। তাই সেই উপহার গ্রহণে তোমরা সচেষ্ট হও’! ইমাম আবু বকর বালখি রহঃ বলেনঃ ‘ রজব হলো বীজবোপন, শাবান হলো সেচ দেয়া ও রমজান হলো ফসল কাটার মাস’। তাই যে রজবে বীজ বোপন করেনি, শাবানে সেচ দেয়নি সে কিভাবে রমজানে ফসল কাটবে।

এজন্য আমাদের সকলের উচিত দৈহিক – আত্মিক পরিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করেই রমজানকে স্বাগত জানানো। আল্লাহ্‌ উত্তম তাওফিক দাতা।

লেখকঃ এমফিল গবেষক, আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মিসর
সংগৃহিত: ইসলামিক ওয়েবসাইট