মোবাইলে জীবন জগৎ – মোঃ রেজাউল করিম সবুজ

বিশ্বায়নের যুগে মোবাইল আমাদের অপরিহার্য সঙ্গী। বর্তমান বিশ্বে মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে আনুপাতিক হারে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেশি বলে দেখা যায়। মোবাইল ফোন, হ্যান্ড ফোন বা মুঠোফোন ইংরেজিতে মোবাইল ফোন। মোবাইল অর্থ ভ্রাম্যমান। এই ফোন যে কোন স্থানে বহন করা ও ব্যবহার করা যায় বলে মোবাইল ফোন নামকরণ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন বেতার তরঙ্গের মাধ্যমে কাজ করে। মোবাইল ফোন দিয়ে শুধু কথাই বলা যায় না। এটি দিয়ে টেক্স মেসেজ করা, মাল্টিমিডিয়া মেসেজ করা, ই-মেইল, ইন্টারনেট ব্যবহার করা, ব্লুটুথ সেবা, ক্যামেরা, গেমিং, ই-বিজনেস, মোবাইল ব্যাংকিং, আরও অনেক সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করা যায়। মোবাইল ফোন আবিস্কারের পূর্বে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে মিলিটারীরা প্রথম রেডিও টেলিফোন ব্যবহার করেন। এই রেডিও টেলিফোন ব্যবস্থার আবিস্কারক ছিলেন রেজিনালদ ফেসেন্দেন। ১৯৪৬ সালের ১৭জুন মিসউরির লাউস থেকে বেল টেলিফোন সার্ভিস এর আওতায় প্রথম কল করা হয়। তারপর ১৯৪৬ সালের ২রা অক্টোবর শিকাগো শহর থেকে পূর্বের পথ অনুসরণ করে এলিওন বেল টেলিফোন কোম্পানীর মাধ্যমে আবার টেলিফোন কল করেন। এই টেলিফোনটি ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবে তৈরী। এটার ওজন ছিল প্রায় ৩ কেজি বা ৮০ পাউন্ড। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালের এপ্রিল মাসে মোটোরোলা কোম্পানিতে কর্মরত ডঃ মার্টিন কুপার এবং জন ফ্রান্সিস মিচেল প্রথম প্রায় ১ কেজি ওজনের হাতে ধরা ফোন উদ্ভাবন করেন। মোবাইল ফোনে প্রথম বাণিজ্যিক সংস্করণ আসে ১৯৮৩ সালে। বাংলাদেশে মোবাইল ফোন প্রথম চালু হয় ১৯৯৩ সালে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট ৫টি মোবাইল ফোন কোম্পানী চালু রয়েছে। এগুলো হচ্ছে-১। রবি কোড-০১৮, ২। গ্রামীনফোন, কোড-০১৭, ০১৩, ৩। বাংলালিংক, কোড-০১৯, ০১৪, ৪। টেলিটক, কোড০১৫, ৫। এয়ারটেল (বাংলাদেশ), কোড-০১৬। মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে একমাত্র টেলিটক দেশীয় কোম্পানি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর এক তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে মোবাইল ফোনের সক্রিয় সংযোগ বা সিমের সংখ্যা ১৪ কোটি ৭লাখ। একই সময় মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ০৭ কোটি ৯২ লাখ।

বিজ্ঞানের যে কোন আবিস্কারের মত মোবাইল ফোনের ভাল খারাপ দুটি দিকই রয়েছে। ঘুম ভাঙ্গা ভোর থেকে শুরু করে ঘুম না আসা রাতের ঘোর অন্ধকার পর্যন্ত জরুরী মুহুর্তে মোবাইল ফোন মানুষের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়ে দিতে পারে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ চলে এসেছে মানুষের হাতের মুঠোয়। মোবাইল যোগাযোগের মাধ্যমে সারা বিশ্বের মানুষ একটি সমাজে পরিনত হয়েছে। এর মাধ্যমে মানুষের সময় ও দুরত্ব কমে এসেছে। ব্যবহারকারী একে যেভাবে ব্যবহার করে এটি সেভাবেই ব্যবহ্নত হয়। একটি এন্ডুয়েট মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ইন্টারনেট ব্যবহার এর মাধ্যমে সহজেই সংবাদপত্র পাঠ, তথ্য সংগ্রহ, তথ্য আদান-প্রদান, যোগাযোগ, শিক্ষা ও গবেষনার কাজ, কেনা-কাটা, ব্যবসা-বানিজ্য, সামাজিক যোগাযোগ, বিনোদন, ভিডিও কনফারেন্সসহ অনেক কাজ সহজেই করতে পারে। ইন্টারনেট এর মাধ্যমে মানুষ জানতে পারে অজানাকে। মোবাইলের সাহায্যে বিদুৎ, ওয়াসা ও গ্যাস বিল পরিশোধ করা যায়। বর্তমানে মোবাইলের মাধ্যমে সকল পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সহজেই আমরা জানতে পারি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভর্তি ফ্রি জমা দেয়া যায়। এছাড়া সকল চাকুরির আবেদন থেকে শুরু করে ফলাফল সহ সকল তথ্য আমরা অতি সহজেই মোবাইলের মাধ্যমে জানতে পারি। মোবাইলের মাধ্যমে ঘরে বসে বাস, ট্রেন, বিমানের টিকেট পর্যন্ত অতি অল্পসময়ে সংগ্রহ করা যায়। দ্রুততম সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে টাকা পাঠানোর বর্তমানে জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং। একটি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যে কেউ ব্যাংক একাউন্ট খুলতে পারেন। মোবাইলের মাধ্যমে টিভি দেখা যায়, উপভোগ করা যায়, নাটক, সিনেমা, গান, খেলাধুলা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান। রাজনীতি, শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রেম ভালবাসা সবকিছুই মোবাইলের কল্যাণে সহজ হচ্ছে। বাংলা একটি প্রবাদ ছিল-সবজান্তা সমশের, এখন সবজান্তা বলা হয় ইন্টারনেটকে।

মোবাইল ব্যবহারের ভাল দিকের সাথে খারাপ দিকও রয়েছে। স্বাস্থ্যগত ঝুকির মধ্যে রয়েছে এর ব্যবহারকারীরা। কিছু মানুষ প্রয়োজন না থাকলেও তাদের মোবাইলের ফেসবুক, ই-মেইল বা বিভিন্ন গেইম নিয়ে ব্যস্ত থাকে যার কারণে কাজের একাগ্রতা নষ্ট হয়। যারা মোবাইল ফোন চোখের কাছাকাছি এনে ব্যবহার করেন, তাদের ধীরে ধীরে মাথাব্যাথা, চোখ ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখাসহ নানা সমস্যায় আক্রান্ত হন। মোবাইল ফোন থেকে যে তেজস্ক্রিয়তা নির্গত হয় তা মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। আমরা অনেক ব্যবহারকারী রাতে ঘুমানোর সময় মোবাইল কাছে রেখে ঘুমিয়ে পড়ি। মোবাইল ফোন থেকে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয়তা মানুষের হার্টের স্বাভাবিক কর্মকান্ডকে ব্যহত করে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, যেসব পুরুষ বা ছেলে খুব বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন তাদের শুক্রাণু খুব দ্রুত হ্রাস পায়। যারা দীর্ঘক্ষণ মোবাইলে কথা বলেন তাদের কানের বিভিন্ন সমস্য বা কানে কম শোনার ঝুঁকি বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশে কিছু মোবাইল ব্যবহারকারী রয়েছে যারা সব কিছু ভুলে কথা বলতে বলতে চলতে থাকে যার কারণে রাস্তা পারাপার বা ট্রেন লাইন অতিক্রম করার সময় অমনোযোগী থাকার কারণে ঘটছে বড় ধরনের দুঘটনা। মাঝে মাঝে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখা যায় মোবাইল ফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার কুপ্রভাবে আত্মহত্যা, খুন, ধর্ষন, পরকীয়াসহ নানাবিধ ঘটনা ঘটছে। মোবাইল ব্যাবহারকারী ইন্টারনেট এর মাধ্যমে এমন সাইটগুলোতে প্রবেশ করে যার মাধ্যমে নৈতিকতা হারানোর সম্ভবনা থাকে। আবার অনেক ব্যবহারকারী ইচ্ছাকৃতভাবে প্রবৃত্তির তাড়নায় পর্নো সাইট ব্যবহার করে নিজেকে বিকৃত মানসিকতার হিসেবে তৈরি করে। অনেক কিশোর-কিশোরী মোবাইল ইন্টারনেটের মাধ্যমে যৌন আচরনে প্রলুব্ধ হচ্ছে, এর মাধ্যমে অবাস্তব বিষয় দেখে বাস্তবে তা রূপ দিতে গিয়ে বিভিন্ন সামাজিক সম্যসা তৈরি করছে। আমাদের শিশুদের জন্য মোবাইল ফোন ব্যবহার বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে। মোবাইল ফোনের তেজস্কিয়তা সবার জন্যই ক্ষতিকর, বিশেষ করে এতে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে। শিশুরা মোবাইল দিয়ে গেইম খেলছে, কার্টুন দেখছে। শিশুদের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিলে অনেক সময় তারা ক্ষেপে যায়। মোবাইল ফোন ব্যবহার শিশুদের শ্রবণ ক্ষমতা হ্রাস করে, মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঝি রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেই এখন ১৮ বছরের কম বয়সীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আমাদের দেশে ১৮ বছরের কম বয়সীদের মোবাইল ব্যবহার অবৈধ। জাতীয় পরিচয় পত্র ছাড়া মোবাইল সিম ক্রয় করার নিয়ম নেই। শিশুরা যাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার না করে সেইদিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখা উচিত। আজকের শিশুদের মোবাইল ব্যাবহারের ক্ষতিকর বিষয়টি তাদের পূর্ণবয়স্ককালে অনুধাবন করতে পারবে। সেইসময় এ সংক্রান্ত রোগীর সংখ্যা মহামারী পর্যায়ে পৌছতে পারে। একটু সচেতন হলেই আমরা মোবাইল ফোন ব্যবহারের কারণে তৈরি স্বাস্থ্য ঝুঁকি থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারি। আসুন আমরা আগামী সুন্দর পৃথিবী নির্মাণে আধুনিক বিজ্ঞানের উদ্ভাবিত মোবাইল ফোন ব্যবহারে সচেতন হই। (ইন্টারনেট অবলম্বনে)

লেখক – মোঃ রেজাউল করিম সবুজ সেকশন অফিসার (সংস্থাপন), জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ।