যে ছবিতে নিন্দার ঝড় ফেসবুকে

দুজন বয়স্ক মানুষ। বয়স অনুমান ষাটের ঘর পেরিয়েছে। না পেরোলেও কাছাকাছি। ছবিতে দেখেই মনে হচ্ছে গ্রামের খেঁটে খাওয়া মানুষ। দারিদ্রতার ছাপ জীর্ণ পোশাকে। চেহারাতেও সেই মলিন ভাব। রোদে পুড়ে কালচে হয়ে গেছে। তার চেয়েও নির্মমতা হচ্ছে, তারা দুজনই দুটো কান ধরে আছেন। বোঝাই যাচ্ছে, সাজা দেওয়া হয়েছে তাদের।

বয়স্ক মানুষ ‍দুটোর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন। তাদের একজন নারী। যার হাতে মুঠোফোন। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনি বুড়ো মানুষগুলোর সাজার দৃশ্যটি মুঠোফোন ধারণ করছেন।

ছবিটি শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ফেসবুকের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে গেছে। ছবিটির পোস্ট করে মানুষ উগড়ে দিচ্ছেন ঘৃণা। সমালোচনা বান ডেকেছে ওই নারীর বিরুদ্ধে। ‘কী করে বাবার বয়সী বৃদ্ধ মানুষদের এমন শাস্তি দিতে পারেন তিনি! বিবেক বলতে কি কিছু নেই? মনুষত্ব্যবোধ, সেও কি হারিয়ে গেছে?’ ‘ছি! ছি!’ মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ।

ছবিগুলোর নিচে অশালীন ভাষা ব্যবহার করেও ওই নারীকে ধিক্কার জানাচ্ছেন মানুষ।

ছবিটির সূত্র ধরে জানা যায়, ওই নারী কর্মকর্তার নাম সাইয়েমা হাসান। তিনি যশোর জেলার মণিরামপুর উপজেলার সহকারী ভূমি কমিশনার। তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে মণিরামপুর উপজেলার অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গেলে (http://manirampur.jessore.gov.bd) বিস্মিত হতে হয়। ওয়েবসাইটের হোম পেইজে একই ধরনের আরেকটি ছবি দেখা যায়। যেখানে সাদা দাড়িমুখের একজন বৃদ্ধকে দেখা যায় ওই একই কায়দায় কান ধরে আছেন। আর বিপরীতে দাঁড়িয়ে একজন নারী কর্মকর্তা ছবি তুলছেন। ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই নারীর পোশাক-পরিচ্ছদের সঙ্গে ওয়েবসাইটের ছবিটির নারীর হুবহু মিল রয়েছে। ছবির গায়ে ডান পাশে লেখা, ‘মণিরামপুর উপজেলা। সাইয়েমা হাসান। সহকারী ভূমি কমিশনার।’ ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ৩৪ ব্যাচের কর্মকর্তা।

কী কারণে ওই দুই বৃদ্ধ এবং ওয়েবসাইটের ছবির বৃদ্ধকে কানে ধরিয়ে সাজা দেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট করে জানা যায়নি। তবে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্টে লেখা হচ্ছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ঘরের বাইরে মাস্ক পরে বের হওয়ার যে নির্দেশনা সরকার তরফে দেওয়া হয়েছে, তা অমান্য করায় তাদের এই সাজা দেওয়া হচ্ছে। আসলেই কী কারণে তাদের এমন সাজা দেওয়া হয়েছে তা জানার জন্য সাইয়েমা হাসানের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করে পোস্ট দিয়েছে। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রভাষ আমীন লেখেন, ‘দেশে কিন্তু কোনো কারফিউ নেই, লকডাউনও নেই। করোনার বিস্তার ঠেকাতে সবকিছু বন্ধ করে সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস থেকে দেশ কার্যত স্থবির। করোনা আতঙ্কে সবাই ঘরে ঢুকে পড়েছেন। তবুও জীবন থেমে থাকে না। কিছু মানুষকে ঘর থেকে বেরুতেই হয়। কিন্তু গত দুদিনে ঘর থেকে বেরুনো মানুষের সাথে পুলিশের দুর্ব্যবহার করেছে, লাঠিপেটা করেছে। কেন? তাদের অপরাধ কী? শুক্রবার যশোরের মণিরামপুরের চিনেটোলা বাজারে দুই বৃদ্ধ ভ্যানচালক এসেছিলেন চাল-ডাল কিনতে। উপজেলার এসিল্যান্ড সাইয়েমা হাসান মাস্ক না পরার অপরাধে সবার সামনে তাদের কান ধরে ওঠবস করান। আবার নিজের বীরত্বের ইতিহাস মোবাইলে ধারণও করছেন।’

এছাড়া শ্যামল কান্তি বিশ্বাস নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ‘মৌলিক অধিকার’ অংশে বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ ধারা-৩৫ এর ৫ উপ-ধারায় বলা আছে, ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’

একই পোস্টে শ্যামল কান্তি বিশ্বাস লেখেন, ‘সরকারের কাছে দাবি জানাই অনতিবিলম্বে এই অশিক্ষিত ও বর্বর সহকারী কমিশনারকে আমাদের যশোর জেলা থেকে প্রত্যাহার করা হোক।’

কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, ‘দুই বয়স্ক মানুষকে কান ধরে উঠবস করাচ্ছে পুলিশ। অপরাধ, তারা রাস্তায় বেরিয়েছেন। সম্ভবত একজন ম্যাজিস্ট্রেটও ছিলেন সেখানে। যে নির্বোধ নারীটি উঠবসের ছবি তুলছিলেন তিনিই হয়ত ম্যাজিস্ট্রেট। জানি না। সেই ছবি আবার ফেসবুকেও ছেড়েছে। অসভ্যতার সীমা থাকা উচিত। এগুলো ক্ষমতার অপব্যবহার।’-দ্যা রিপোর্ট ২৪