স্ত্রীকে কাধে নিয়ে ১৪ বছর পার, প্রধানমন্ত্রীর নজরে ত্রিশালে নজিরবিহীন অন্ধ ভালবাসায় সোহেল—রওশন দম্পতি

ফারুক আহমেদ, ত্রিশাল :
গণমাধ্যম ও স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া সোহেল—রওশনের নজিরবিহিীন অন্ধ ভালবাসার গল্পটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ায় তা নজর কেড়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তাদের অবস্থার বিষয়ে খোঁজখবর নিতে দেওয়া হয়েছে নির্দেশনা। সেই পরিপেক্ষিতে বুধবার বিকেলে তাদের বাড়িতে যান ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তারুজ্জামান। বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমকে নিশ্চিত করে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক এনামুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশ পাওয়ার পর আমি নিজে ওই দম্পতির সাথে কথা বলেছি। পরে সরেজমিন তাদের খোঁজখবর জানতে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ওই দম্পতির বাড়িতে গিয়ে খোজঁখবর নেন ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী অফিসার। শুরুতেই সোহেল—রওশন দম্পতিকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও মেয়ে স্মরণীকে চকলেট উপহার দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আক্তারুজ্জামান। পরে পরিবারটির নানা সমস্যা ও কষ্টের কথা শোনেন এবং সেগুলো দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জানিয়ে সমাদানের আশ্বাস দেন তিনি।


এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বলেন ভালবাসার যে নিদর্শন তৈরি করেছেন সোহেল—রওশন দম্পতি অতিবিরল। পরিবারটির চাহিদার কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন সরেজমিন এসে আমারা দেখলাম ও জানতে পারলাম এবং একটি প্রতিবেদন তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাব। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে খোঁজ খবর নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন সোহেল—রওশন দম্পতি।
উল্লেখ্য ছেড়ে না যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ১৪ বছর আগে ভালোবেসে রওশনের হাত ধরেন সোহেল। তাদের এই চলার পথটা মোটেও সহজ ছিল না। কেননা অন্য আর দশটা মেয়ের মতো সুস্থ স্বাভাবিক নন ময়মনসিংহের ত্রিশালের রওশন আক্তার। তবে ভালোবাসা অন্ধ তার প্রমাণ দিয়েছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ীর সোহেল মিয়া। ভবিষ্যত নানা সমস্যা আসবে জেনেও সকলের অমতে আবদ্ধ হন বিয়ের বন্ধনে।
ত্রিশালের গুজিয়াম টানপাড়া গ্রামে ছোট্ট মাটির ঘর আর একটি টং দোকানই সম্বল এ দম্পতির। শত কষ্টের মাঝেও ভালোবাসা আর পরস্পর আস্থা—বিশ্বাসই যেন তাদের কাছে সুখের পালক।
জানা গেছে, জন্ম থেকেই দুই পা অচল রওশনের। পায়ে ভর দিয়ে নেই চলার শক্তিটুকুও। স্বামীর পিঠে চড়ে চলাচল করেন এখানে—সেখানে। হয়েছেন সন্তানের মা। কঠিন এ জীবন সংগ্রামে মসৃণ পথ তৈরির মূলে ছিল প্রেম, ভালোবাসা, ভরসা আর বিশ্বাস।


৮ ভাই—বোনের মধ্যে সবার ছোট সোহেল মিয়া। ছোটবেলায় হারিয়েছেন বাবা—মাকে। ভাই—বোনের কাছে থেকে পড়াশোনা করেছেন । রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ভালো চাকরি নেন সোহেল। এক পর্যায়ে সচ্ছলতার জীবন ছেড়ে অভাবের সংসার মেনে নিয়েছেন অসহায় স্ত্রীর পাশে থাকতে। ভালোবাসা যেখানে অভাব অনটন দেখে দৌঁড়ে পালায়, সেখানে অভাবকে ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন এ দম্পতি।
সোহেল মিয়া বলেন, পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অফিস এক্সিকিউটিভ পদে চাকরি করতাম। এক দিন বিকেলে অফিস ছুটির সময় আমার টেবিলের ড্রয়ারে থাকা একটি ১০ টাকার নোটে একটি নম্বর লেখা দেখতে পাই। ওই নম্বরে এক দিন কল করি। সেই কলের মাধ্যমেই রওশনের সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। আস্তে আস্তে পেপ্ররে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে আমাদের প্রেমের শুরুটা হলেও আমরা ডিসেম্বরে গিয়ে বিয়ে করি।
তিনি আরও বলেন, শারীরিকভাবে চলাচলে অক্ষম থাকলেও তার ভেতরে আমার প্রতি ভালোবাসার কোনো কমতি আজ পর্যন্ত পাইনি। একজন স্বাভাবিক মেয়ে স্বামীর জন্য যতটুকু না করতে পারে সে তার চেয়েও বেশি কিছু করার চেষ্টা করে। সে আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। আর আমিও তার প্রতি পুরোপুরি দুর্বল।
রওশন আক্তার বলেন, আমি প্রতিবন্ধী হওয়ায় আমার পরিবার থেকেও বিয়েতে সম্মতি ছিল না। সে সময় সবাই বলাবলি করেছে, বিয়ের পর আমাকে ছেড়ে চলে যাবে। কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল, আমি যাকে ভালোবাসব সেও আমাকে ভালোবাসবে। এই বিশ্বাসটাই আমি সোহেলের ওপর করতে পেরেছিলাম। সেজন্য সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে তার হাত ধরে আমি পালিয়ে যাই এবং বিয়ে করি। মেয়ে হওয়ার পর আমাদের ভালোবাসা যেন আরও বেড়ে গেছে।
রওশন আক্তার বলেন, কখনো কোথাও যেতে চাইলে আমি শুধু বলি আর সে তার পিঠে আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া—আসা করে। আমার মনের চাহিদা পূরণের জন্য সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে। তাকে আমি ধন—সম্পদ কিছুই দিতে পারিনি, শুধু আমার ভালোবাসাটুকুই দিয়েছি। আর সে আমার ভালোবাসা নিয়েই এখনো আমার সঙ্গে আছে। আমরা সুখেই আছি।
সোহেল মিয়া বলেন, আমাদের সময়ের ভালোবাসাটাই ছিল অন্যরকম। অচল—অক্ষম মেয়েকে যেভাবে অন্ধের মতো ভালোবেসেছি, তার মাঝেও তেমন ছিল অন্ধ প্রেম। এমন প্রেম এখন আর দেখা যায় না। এখনকার প্রেম হল প্রথমে দেখা, তারপর কথা, পরে অন্যকিছু। এই আছে এই নেই। কিন্তু আমাদের প্রেম ছিল পবিত্র, সৃষ্টিকর্তার তরফ থেকে পাওয়া।
সোহেল—রওশনের এমন নজিরবিহীন ভালোবাসার বন্ধন রীতিমতো অবাক করে স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও। তারা বলেন, আমরা প্রথম অবস্থায় সোহেলকে বিশ্বাস করতে পারিনি। কারণ প্রতিবন্ধী মেয়েকে বিয়ের পর কিছু দিন পর তাকে চলে যাক এমনটা আমরা চাইনি। তখন তাদের মতামতেই তারা বিয়েটা করে। কিন্তু তাদের মধ্যে যে প্রেমের এতটা আকর্ষণ তা বুঝতে পারিনি। সত্যিকারের প্রেম যে কতটা গভীর তা তাদের দেখেই আমরা বুঝতে পারি। রওশনকে পিঠে নিয়ে সোহেল যেভাবে আনা—নেওয়া করে তা দেখে আমরা সত্যিই অবাক হই।
ভালোবাসা মানে একজনের কাছে আরেকজনের দায়বদ্ধতা। সুখে—দুঃখে সব সময় পাশে থাকা। সুখ—দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার নামই ভালোবাসা। তবে স্বাথের্র দুনিয়ায় যেখানে ঠুনকো আঘাতে সম্পর্ক ভাঙনের ছড়াছড়ি, সেখানে একজনের দু—পায়ে ভর দিয়ে দুটি মানুষ কাটিয়ে দিয়েছেন ভালোবাসার ১৪টি বছর।