শত বছর বয়সী শহীদ জননীর শেষ আকুতি প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষাৎ

মাসদ রানা, ময়মনসিংহ ২১ জানুয়ারি :
১৯৭১ সাল। রক্তাক্ত বাংলাকে পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত করতে নিজের টগবগে সন্তানকে এক মা যুদ্ধে পাঠিয়ে স্বপরিবারে নির্যাতনের শিকার হন। হানাদার বাহিনী নির্মম অত্যাচার চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন জ্বালালেও তিনি ছিলেন অনড়। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর ১০৫ বছর বয়সে তিনি একটি কামনায় বুক বেঁধে আছেন। একবার বঙ্গবন্ধু কণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি দেখতে চান। করতে চান দোয়া। মনের কিছু আকুতি জানিয়ে কতা বলতে চান প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে।

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার ১০ নং খেরুয়াজানি ইউনিয়নের বন্দগোয়ালিয়া গ্রামের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের ১০৫ বছর বয়সী জননী হাজেরা খাতুনের বুক ফাটা কাঁন্নায় এসব কথা প্রকাশ করেন। জীবনের শেষ গোধূলি বেলায় একটি ইচ্ছা নিয়ে আশায় বুক বেঁধে আছেন গত ২০ বছর যাবৎ। কবে পাবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার স্বাক্ষাৎ। তার এই ইচ্ছার কথা মুক্তাগাছার অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকে তিনি গত ২০ বছর ধরে বলে আসছেন। কিন্তু কেউ এ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার দেখা করার কথা পৌছে দিতে পারেনি। এমনকি ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষাতের অপেক্ষায় ২৫ দিন রাজধানীর ঢাকায় কাটিয়েছেন তিনি।

মুক্তাগাছা মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্য রাশিদা জানান, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের তৎকালিন এক নেতার সাথে কথা বলেন তিনি। তার আশ্বাসে ঢাকায় গিয়েও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার সুযোগ পাননি। আজও আশা ছাড়েননি শহীদ জননী হাজেরা খাতুন।

অন্যদিকে মুক্তাগাছা মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশিদার কাছ থেকে কথায় কথায় বিষয়টি সম্পর্কে জানতে পারেন ময়মনসিংহ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বেগম নুরুন্নাহার সেফালী। তিনি সাবেক ধর্মমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের স্ত্রী। সবকিছু শুনে বেগম নুরুন্নাহার অনেকটা আবেগ আপ্লুত হয়েই গত শনিবার বিকেলে ছুটে যান মুক্তাগাছার বন্দগোয়ালিয়া গ্রামে। কথা বলেন শহীদ পরিবারটির সাথে। বয়োবৃদ্ধ হাজেরা খাতুনের হাতে তুলে দেন ফুলের তোড়া, কিছু টাকা, শাড়ি, শীতের কম্বল।

মুক্তাগাছা শহর থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দুরে ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বসবাস করেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের মা, ভাই ও তাদের পরিবার। বেগম নুরুন্নাহার কথা বলেন শহীদ নুরুল ইসলামের মা ও দুই ভাইয়ের সাথে। যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের পরিবারের উপর পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত লোমহর্ষক নির্যাতনের বর্ননা করেন শহীদ নুরুলের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম ও আব্দুল কুদ্দুস।

অশ্রুসিক্ত হাজেরা খাতুনের সবটুকু স্মৃতিচারণ জুড়েই ছিলো মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তান নুরুলকে ঘিরে। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে নিজের হাতে শেষবার খাওয়ানোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠেন। নিজের অবুঝ দুই সন্তান,স্বামীর উপর পাকিস্তানি বাহীনির পাশবিক নির্যাতনের বর্ননা শুনে উপস্থিত সকলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

শহীদ নুরুল ইসলাম কালিহাতি যুদ্ধে অংশ নেন। এরপর শেপুরের যুদ্ধরত অবস্থায় শহীদ হন। শেরপুর রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে তাকে সমাহিত করা হয়। হাজেরা খাতুনের আকুতি শহীদ সন্তানের কবরটি চিহ্নিত করে বাধাই করা ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে স্বাক্ষাৎ করা।