যুবলীগের চেয়ারম্যান পরশ, সাধারণ সম্পাদক নিখিল

কেলেঙ্কারিতে ভাবমূর্তি সঙ্কটে থাকা যুবলীগকে উদ্ধারের দায়িত্ব পেলেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা শেখ ফজলুল হক মনির ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। শনিবার সকালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কংগ্রেস উদ্বোধনের পর বিকালে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বসে কাউন্সিল অধিবেশন।

কাউন্সিলের নেতৃত্ব নির্বাচনের অধিবেশনে কংগ্রেস প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান চয়ন ইসলাম পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে পরশের নাম প্রস্তাব করেন। তখন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদ তা সমর্থন করেন। আর কোনো নামের প্রস্তাব না ওঠায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যুবলীগের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন পরশ।

যুবলীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সংগঠনটির ঢাকা মহানগর উত্তরের সদ্য সাবেক সভাপতি মাইনুল হোসেন খান নিখিল।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ মনির বড় ছেলে পরশ এতদিন রাজনীতি থেকে দূরেই সরিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে। শিক্ষকতা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির এই সাবেক ছাত্র। তার ছোট ভাই শেখ ফজলে নূর তাপস ইতোমধ্যে রাজনীতিতে এসে সংসদ সদস্য হয়েছেন, আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবী সংগঠনের নেতাও হয়েছেন। পরশ-তাপসের চাচা শেখ ফজলুল করিম সেলিম আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীতে রয়েছেন। শেখ সেলিমও এক সময় যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন।

শেখ সেলিমের ভগ্নিপতি ওমর ফারুক চৌধুরীও হয়েছিলেন যুবলীগের চেয়ারম্যান; অর্থাৎ পরশের ঠিক আগেই যুবলীগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ছিলেন তারই ফুপা ওমর ফারুক। ওমর ফারুকের দায়িত্ব পালনের মধ্যেই বিতর্কের মধ্যে পড়তে হয় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সক্রিয় যুবলীগকে।

গত সেপ্টেম্বরে এক সভায় যুবলীগ নিয়ে শেখ হসিনার উষ্মা প্রকাশের পর ঢাকায় ক্যাসিনো বন্ধে র‌্যাবের অভিযানে প্রকাশ পেতে থাকে তাতে জড়িত সংগঠনটির নেতাদের নাম, গ্রেপ্তারও হন কয়েকজন নেতা।

শুরুতে এতে ক্ষোভ জানিয়েছিলেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক; পরে নিশ্চুপ হয়ে যান তিনি। ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে থাকা যুবলীগ নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ আসতে থাকে তার বিরুদ্ধেও।

এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার নির্দেশে যুবলীগ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় ওমর ফারুককে, বহিষ্কার করা হয় ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটসহ দাগিদের।

সম্মেলন বা কংগ্রেসের দিন তারিখও দিয়ে দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ থেকে; তার আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাবেক সংসদ সদস্য চয়ন ইসলামকে।

সম্মেলন প্রস্তুতির জন্য যুবলীগের যে কমিটি হয়েছে, তাতে আকস্মিকভাবে পরশের যুক্ত হওয়া দেখে সবার আলোচনায় আসে তার নামটি।

সম্মেলন প্রস্তুতি দেখতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শুক্রবার যখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গিয়েছিলেন, তখন তার সঙ্গে পরশ ছিলেন। এরপর সম্মেলনের অভ্যর্থনা উপ-কমিটির বৈঠকে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের কার্যালয়ে তিনি গেলে কর্মীরা করতালি দিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান।

আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, এতদিন ধরে রাজনীতিবিমুখ পরশ তার ফুপু শেখ হাসিনার নির্দেশেই রাজনীতিতে নামছেন। সৎ ও মেধাবী নেতৃত্ব তুলে আনার অংশ হিসেবেই পরশের মতো একজনকে রাজনীতিতে আনা শেখ হাসিনার নিজস্ব চিন্তার ফসল।

পঁচাত্তর ট্রাজেডিতে বাবা-মাকে হারানো পরশ-তাপসের বেড়ে ওঠা চাচাদের সঙ্গে। পরশ ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজের থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেওয়ার পর দেশে ফিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা করে আসছিলেন তিনি।

রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হলেও রাজনীতির মাঠে দেখা যেত না তাকে। এমনকি ছোটভাই তাপসের নির্বাচনী প্রচারেও তাকে খুব-একটা নামতে দেখা যায়নি। কিন্তু এবার ফুপুর নির্দেশ উপেক্ষা করতে না পেরে বাবার গড়া সংগঠনের দায়িত্ব নিতে হল তাকে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’। তিনি সংগঠনটির দায়িত্ব দেন নিজের ভাগ্নে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক শেখ মনিকে।

দুই বছরের মাথায় কংগ্রেসে শেখ মনিই যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে শেখ মনি নিহত হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে যুবলীগের পুনর্জাগরণে সংগঠনটির চেয়ারম্যান হন আমির হোসেন আমু।

এরপর তৃতীয় কংগ্রেসে মোস্তফা মহসিন মন্টু, চতুর্থ কংগ্রেসে শেখ ফজলুল হক সেলিম, পঞ্চম কংগ্রেসে জাহাঙ্গীর কবির নানক যুবলীগের চেয়ারম্যান হন। ২০১২ সালে ষষ্ঠ কংগ্রেসে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান ওমর ফারুক।