মৃত্যু যুবকের সৎকারে পরিবার না আসলেও এগিয়ে এলো জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ

রুপক চক্রবর্তী শরীয়তপুর :
“মানুষ মানুষের জন্য” কোন মানুষ বিপদে পড়লে তার পাসে এসে দাঁড়িয়ে অন্য মানুষ ঐ বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করবে এমনটাই তো হওয়া উচিত তাই না? হ্যাঁ এমনটাই হয়েছে শরীয়তপুর জেলায়। শরীয়তপুরে করোনা সন্দেহে মৃত সুশান্ত কর্মকারের সৎকারে পরিবার ও এলাকাবাসী পিছিয়ে গেলেও সহমর্মিতার ও মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ। গত ৮ই এপ্রিল বুধবার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সুশান্ত কর্মকার(৩৪) নামে এক যুবক। ঐ যুবকের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলা ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নে। গত ৭ই মঙ্গলবার মৃত সুশান্ত কর্মকারকে জ্বর, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঐ যুবকের এলাকায় বহু প্রবাসী রয়েছে এবং ইতিমধ্যে অনেকেই দেশে এসেছে তাই তাকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরই আইসোলেশনে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তার দেহে করোনা ভাইরাস আছে কিনা তা জানার জন্য বুধবার সকালে নমুনাও আইইডিসিআর এ পাঠানো হয়েছিলো কিন্তু রিপোর্ট আসার আগেই ঐ দিন বিকালে সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

বর্তমানে সারাবিশ্বে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক বিরাজ করছে। মৃত সুশান্ত কর্মকার যেহেতু আইসোলেশনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গিয়েছে তাই তার এলাকার জনগণের মনে ধারনা জন্ম নিয়েছে যে সুশান্ত কর্মকারও করোনায় আক্রান্ত হয়েই মারা গিয়েছে তাই তার মরদেহ নিজ এলাকায় সৎকার করতে দিবে না এবং সৎকার করার লোকও খুজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমনকি পিছিয়ে গিয়েছে আপন ভাইও। শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে মৃত ছেলের মরদেহ নিয়ে যখন চোখের জল ফেলে আহাজারি করে আর্তনাত করতে ছিলো সুশান্তর
বৃদ্ধ মা গঙ্গা রানী কর্মকার তখন সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার নেতৃবৃন্দ।

বুধবার বিকাল থেকে শুরু করে বহু চেষ্টা করেও সৎকার করার লোক এবং স্থান নির্ধারন করতে পারে নি জেলা প্রশাসন ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। কিন্তু তারা থেমে যায়নি এরপরে বৃহস্পতিবার সকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি বাবু মুকুল চন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় নড়িয়া উপজেলায় অবস্থিত শ্রী শ্রী সত্যনারায়ন সেবা মন্দির অথাৎ রাম ঠাকুর বাড়িতে মরদেহ সৎকার করার স্থান নির্ধারন করা হয় এবং সৎকার করার জন্য ৪জন লোক ঠিক করা হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কাজ সম্পন্ন করেছেন ভেদরগঞ্জ উপজেলার রামভদ্রপুর গ্রামের পরিমল বাড়ৈ, রণজিৎ মণ্ডল, নড়িয়ার বাড়ৈপারা গ্রামের উত্তম পাল, ঘড়িসার গ্রামের অনুকূল ঘোষ ও চাকধ গ্রামের সঞ্জয় বণিক। বৃহস্পতিবার দুপুর আনুমানিক ১টার দিকে রামঠাকুর বাড়িতে মরদেহ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সটি এসে পৌছে এবং তার কিছু সময় পরই জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের তত্বাবধায়নে যারা সৎকার কর্ম করবে তাদের পিপিই পরিধান করিয়ে সৎকার কার্যক্রম শুরু করা হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়ন্তী রুপা রায়, নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি ত্রিনাথ ঘোষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়িয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির চক্রবর্তী, সাংগঠনিক সম্পাদক রাজন পাল, নড়িয়া উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি চন্দন ব্যানার্জী, বাংলাদেশ ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার আহবায়ক সমীর চন্দ্র শীল সহ প্রমুখ।

সুশান্ত কর্মকারের মৃত্যু হওয়ার পর আপন ভাই, পরিবার, আত্মীয়, এলাকাবাসী সহ যখন সবাই পিছিয়ে গিয়েছে , যখন একাকি ছেলের লাশ নিয়ে হাসপাতালে নিরুপায় হয়ে গর্ভধারীনি মা বসে আছে তখন ঐ মরদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসন, নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ। বিশেষ করে অগ্রনী ভূমিকা পালন করেছেন শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের, নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়ন্তী রুপা রায়, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানিক ব্যানার্জী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক সত্যজিৎ ঘোষ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিহির চক্রবর্তী।

শরীয়তপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানিক ব্যানার্জী বলেন, সারা বিশ্ব বর্তমানে করোনা ভাইরাসের কারনে আতঙ্কিত। বর্তমানে কেউ যদি স্বাভাবিক ভাবে বা অন্য কোন রোগের ফলে ও মৃত্যুবরন করে তাহলে প্রাথমিক পর্যায়ে ধারনা করা হয় মনে হয় সে বুঝি করোনার কারনেই মারা গেছে। গত মঙ্গলবার শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ডিঙ্গামানিক ইউনিয়নের সুশান্ত কর্মকার নামে এক যুবক শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে জ্বর কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়। পরে তাকে আইসোলেশনে রেখে চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছিল। ঐ যুবক গত বুধবারে বিকেলে মারা যায়। আমরা জানতে পাই যে ঐ যুবকের করোনার কারনে মৃত্যু হয়েছে এমন সন্দেহে তার এলাকার লোকজন তার সৎকার করবে না এবং ঐ এলাকায় সৎকার করতে দিবে না। এ কথা শুনার পরে আমরা সিন্ধান্ত গ্রহন করি যে আমাদের একটি হিন্দু ভাই মৃত্যুবরন করে সৎকার বিহীন ভাবে হাসপাতালে পড়ে থাকবে এটা হতে পারে না। এরপরে আমরা বহু চেষ্টা করেও বুধবার সৎকারের করার লোক এবং স্থান নির্ধারন করতে পারি। বৃহস্পতিবার আমাদের পূজা উদযাপন পরিষদ শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি বাবু মুকুল চন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় আমরা রামঠাকুর বাড়িতে মরদেহ সৎকার করার স্থান নির্ধারন করি এবং সৎকার করার লোকও ঠিক করতে সক্ষম হই। যখন সবাই পিছিয়ে গিয়েছে তখন আমরা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থেকে সৎকার কার্যক্রম পরিচালিত করেছি। এ বিষয়ে মাননীয় পানিসম্পদ উপমন্ত্রী, শরীয়তপুর ২ আসনের সংসদ সদস্য, এ কে এম এনামুল হক শামীম সার্বক্ষনিক আমার সাথে এবং সৎকার স্থানে উপস্থিত মিহির চক্রবর্তীর সাথে যোগাযোগ করেছেন। আমি হৃদয়ের হৃদয় স্পন্দন থেকে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, নড়িয়া উপজেলা প্রশাসন ও পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমরা শরীয়তপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদ সদা সর্বদা হিন্দুধর্মাবল্বীদের পাসে ছিলাম আছি এবং থাকবো।

উল্লেখ যে, মৃত সুশান্ত কর্মকারের দেহে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ আছে কিনা এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার যে নমুনা শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইইডিসিআর এ পাঠিয়েছেন তার রিপোর্ট ৯ই এপ্রিল এসেছে এবং উক্ত রির্পোটে সুশান্ত কর্মকারের দেহে করলো নেগেটিভ বলে জানিয়েছেন জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। ইতিমধ্যে শরীয়তপুর জেলা প্রশাসন কতৃক করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত কিংবা সন্দেহ ভাজন মৃত হিন্দধর্মাবলম্বী ব্যক্তির অন্ত্যােষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য জেলার ৬ উপজেলায় ১০ সদস্য বিশিষ্ট উপজেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।