মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশ, মানবজীবন ও পশুপাখির জন্য মারাত্নক হুমকিস্বরূপ-তামান্না ফেরদৌস

মানবসভ্যতার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো পরিবেশ। পরিবেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণী-জীবনের বিকাশ ঘটে। তাই পরিবেশ ও জীবনের মধ্যে রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র। নানা কারণে পরিবেশ দূষণ সমস্যা প্রকট হওয়ায় মানবসভ্যতা আজ চরম হুমকির সম্মুখীন। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা বর্তমান বিশ্বে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়িয়েছে। বিভিন্ন কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে থাকে যার মধ্যে প্লাস্টিক দূষণ অন্যতম। তাই প্লাস্টিক দূষণ রোধ করতে সারাবিশ্বে নেওয়া হচ্ছে কার্যকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এসবের মাঝেও যে বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে তা হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক হচ্ছে প্লাস্টিকের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ। যে সকল প্লাস্টিকের আকার ২ মাইক্রোমিটার থেকে ৫ মিলিমিটার এর মধ্যে, সে সকল প্লাস্টিককে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক সাধারণত নারডল নামে পরিচিত। নিত্যব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য, কলকারখানা থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থে মিশে থাকা প্লাস্টিক প্রতিনিয়ত পরিবেশের সাথে মিশে যাচ্ছে। তাপমাত্রা, ক্ষুদ্র অনুজীব এবং নানা কারণে এসব প্লাস্টিক ভেঙ্গে যায় এবং পরিণত হচ্ছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকে বা মাইক্রোপ্লাস্টিকে। ২০১৪ সালের প্রথম জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে সামুদ্রিক প্লাস্টিক বর্জ্য দূষণ শীর্ষ দশ জরুরী পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয় এবং মাইক্রো প্লাস্টিকের উপর বিশেষ মনোযোগ প্রদান করা হয়। ২০১৫ সালে দ্বিতীয় জাতিসংঘ পরিবেশ সম্মেলনে, মাইক্রো প্লাস্টিক দূষণ পরিবেশ এবং পরিবেশ বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈজ্ঞানিক সমস্যা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ও ওজোন হ্রাসের পাশাপাশি মাইক্রো প্লাস্টিক একটি বড় বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যা হয়ে উঠে।
আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানে যেমন মাটি, পানি, বাতাসের সাথে সহজেই মিশে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের বাস্তুসংস্থান। নদীর স্রোত, বৃষ্টি, বন্যা ইত্যাদি বিভিন্ন উপায়ে এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুর, নদী এবং সমুদ্রে গিয়ে জমা হচ্ছে। সামুদ্রিক মাছসহ স্বাদুপানির মাছ এদের খাবার হিসেবে গ্রহণ করছে। ফলে এরা সহজেই প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম স্তরের খাদককে দ্বিতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে, দ্বিতীয় স্তরের খাদককে তৃতীয় স্তরের খাদক ভক্ষণ করে, তৃতীয় স্তরের খাদককে সর্বোচ্চ স্তরের খাদক ভক্ষণ করে। এভাবে খাদ্যশৃঙ্খলের পর্যায়ক্রমিক পরিক্রমায় মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে যা শুধুমাত্র মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারকই নয় বরং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করতে এক বিরাট হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের বাংলাদেশের বঙ্গোপোসাগরে সামুদ্রিক মাছ ও অন্যান্য প্রজাতির উপর মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ শীর্ষক এক চলমান যৌথ গবেষণায় জানা যায়, বঙ্গোপোসাগর থেকে আহরিত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও অনুজীবের পেটে ক্ষুদ্র আকারের প্লাস্টিক বা মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত নদী দিয়ে এবং চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভূটান থেকেও প্লাস্টিক বর্জ্য এসে পড়ছে আমাদের বঙ্গোপোসাগরে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. হারুনুর রশীদ বলেন আমরা যেখানেই প্লাস্টিকের দূষণ করি না কেনো তা সাগরে গিয়ে পৌঁছায়। সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের পর তা পানির তোড়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাঙ্গে। ভাঙ্গা অংশগুলো পুনারায় সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে ভেঙ্গে ন্যানো, মাইক্রো এবং ম্যাক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এই ভাঙ্গনের ফলে সৃষ্ট প্লাস্টিকের কিছু উপাদান ( ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য যেমন বিসফিনল এ নির্গত হয়) মানুষের দেহের জন্য মারাত্নক ক্ষতিকর। এইসব মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক মাছসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। সুতরাং এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্নক হুমকিস্বরূপ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের কক্সবাজারস্থ সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার আলী বলেন, কক্সবাজারস্থ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট এর অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণায় বাঁকখালী নদীর মোহনা ও সোনাদিয়ার পাশে সমুদ্রের উপরিভাগের পানি থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক সেম্পল সংগ্রহ করা হয়েছে, লাবণী পয়েন্ট সৈকতের ও কাঁকড়া বিচের বালিতে প্লাস্টিকের দূষণ নির্ণয় করা হয়েছে এবং অপরিশোধিত ও পরিশোধিত ( বাণিজ্যিক) লবণে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ পরিক্ষা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গবেষক দলের প্রধান ড. হারুনুর রশীদ আরো বলেন, বাঁকখালী নদীর মোহনায় পানির উপরিভাগে ভাসমান অবস্থায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২০ হাজারেরও বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া মহেশখালী, টেকনাফ ও শাহপরীর দ্বীপ থেকে সংগৃহীত অপরিশোধিত লবণ কেজিতে প্রায় ১০০০ টি এবং পরিশোধিত লবণে প্রতি কেজিতে পাওয়া গেছে ৭০০ থেকে ৯০০ টি মাইক্রোপ্লাস্টিক।
মাটিতে মিশ্রিত প্লাস্টিক বিভিন্ন ধরণের অনুজীব যেমন সিউডোমোনাস, নাইলন খাদক ব্যাকটেরিয়া, ফ্লাভো ব্যাকটেরিয়া ইত্যাদির মাধ্যমে ভেঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়। জীবাণুবিয়োজ্য প্লাস্টিক ভাঙ্গনের মাধ্যমে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে যা এক প্রকার গ্রীণ হাউস গ্যাস। এছাড়াও ক্লোরিনযুক্ত প্লাস্টিক বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে। যেহেতু প্লাস্টিক মাটিতে পচতে সময় লাগে প্রায় ৪০০ বছর সুতরাং এটি একদিকে যেমন মাটির উর্ভরতা নষ্ট করছে অন্যদিকে এটি ভূগর্ভস্থ পানি ও ভূপৃষ্ঠীয় পানির সাথে মিশে যাচ্ছে। অতঃপর এসব পানি গ্রহণের সাথে সাথে তা আমাদের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে এবং আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্হ হচ্ছি। লন্ডনের কিংস কলেজের এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ গ্রুপের অধ্যাপক ফ্র্যাংক কেলির দাবি বাতাসেও মিশে গেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। কিন্তু বাতাসে এর ঘনত্ব নির্ণয় করা হয় নি। বাতাসে মাইক্রোপ্লাস্টিকের অন্যতম একটি উৎস সম্ভবত ফসলি জমিতে ব্যবহৃত সার। এসব সার শুকিয়ে গেলে তাতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে মিশে যায় বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। এমনকি সিনথেটিক কার্পেট ও কাপড় থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
আমাদের দেশে বিভিন্ন ধরনের নিত্যব্যবহার্য কসমেটিক্স পণ্য, পরিষ্কারক পণ্য যেমন ডিটার্জেন্ট, ফেইসওয়াশ,স্ক্রাব,ক্রিম ইত্যাদিতে ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোবেড তথা মাইক্রোপ্লাস্টিক। এমনকি টুথপেস্টেও ব্যবহার করা হচ্ছে মাইক্রোবেড। দেশে উৎপাদিত এবং বাইরে থেকে আমদানীকৃত এইসব পণ্যে মাইক্রো প্লাস্টিক বিদ্যমান যা দেশের বাজার বা মার্কেট গুলোতে অহরহ পাওয়া যাচ্ছে। এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক কোন প্লাস্টিক থেকে প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরীকৃত মাইক্রোপ্লাস্টিক নয় বরং ইঞ্জিনিয়ারিং উপায়ে তৈরীকৃত মাইক্রো প্লাস্টিক যা এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব পণ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন আমাদের স্বাঁস্থ্যঝুকি রয়েছে অন্যদিকে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এসব কসমেটিক্স পণ্য ব্যবহারের পর তা পানির সাথে মিশে ভেসে যাচ্ছে খাল, নদী কিংবা সমুদ্রে। বর্তমানে অনেক বোতলজাত পানিতেও পাওয়া গিয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এছাড়াও টি-ব্যাগ থেকে তৈরিকৃত চায়ে মিশে যেতে পারে মাইক্রোপ্লাস্টিক। সাধারণত টি-ব্যাগ প্রাকৃতিক ফাইবার দ্বারা তৈরি হলেও তা এঁটে দিতে ব্যবহার করা হয় প্লাস্টিক। উচ্চ তাপমাত্রার প্রভাবে এসব থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক চায়ে ছড়িয়ে যেতে পারে। প্রায় ৯৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটন্ত পানিতে ১১.৬ বিলিয়ন ন্যানোপ্লাস্টিক তথা সেকেন্ডারি মাইক্রোপ্লাস্টিক এর উপস্থিতির কথা জানিয়েছেন কানাডার ম্যাক গিল ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক। এছাড়াও কাপড়ে ব্যবহৃত সিনথেটিক ফাইবার যেমন পলিইস্টার, নাইলন ইত্যাদি থেকেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে।
এভাবেই প্রতিনিয়ত পরিবেশের প্রতিটি উপাদানের সাথে মিশে যাচ্ছে মাইক্রো প্লাস্টিক যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানুষসহ অন্যান্য পশুপাখির উপর। এর ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যতা। ক্যান্সার, হরমোনের তারতম্য, প্রজনন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়া ছাড়াও মারাত্নক সব ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়িয়েছে মাইক্রো প্লাস্টিক। বাংলাদেশে মাইক্রো প্লাস্টিক দূষণ একেবারেই নতুন একটি বিষয় এবং নির্মাতা ও ভোক্তা কেউই মাইক্রো প্লাস্টিকের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নয়। আর তাই মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ লোকচক্ষুর অন্তরালে এক ভয়ঙ্কর গতিতে এগিয়ে চলছে। অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক অনেক কম। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে নদী নালা খাল বিলের দেশ বাংলাদেশ। ফলে পানির অবিরাম প্রবাহ দেশের অধিকাংশ প্লাস্টিক বয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের একমাত্র সাগর বঙ্গোপোসাগরে। আকারে ক্ষুদ্র হওয়ায় বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট পেরিয়েও সহজে চলে যাচ্ছে এসব মাইক্রো প্লাস্টিক। মাইক্রো প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ ক্ষতির হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে সরকারী I বেসরকারী ভাবে বিভিন্ন ধরনের উদ্যেগ গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া অতীতে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথ ভাবে ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। জোর দিতে হবে প্লাস্টিক বর্জ্য পূনর্ব্যবহার, রিসাইক্লিং এর উপর। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে জৈবিক প্লাস্টিকের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। তাছাড়া মাইক্রো প্লাস্টিকের উপর সরকারী ভাবে, বেসরকারী ভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষণা কাজ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি মাইক্রো প্লাস্টিক এবং এর ভয়াবহ দিক সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যেগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী।