ভূয়া নামজারির সময় প্রতারক চক্রের মহিলাসহ আটক-৫

ফারুক আহমেদ :
একটি প্রতারক চক্রের মাধ্যমে জেলার এস এ শাখা, উপজেলা ভূমি অফিসের রেকর্ডরুম ও ইউনিয়ন সহকারী ভূমি অফিসে সংরক্ষিত মূল খতিয়ান বইয়ের পাতা ছিঁড়ে নতুন পাতা সংযোজন করে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে নামজারির চেষ্টা চলছিল। ওই চক্রের সঙ্গে জড়িতরা গতকাল মঙ্গলবার সকালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে উপজেলা সহকারী (ভূমি) অফিস কার্যালয়ে আসে ২ একর ৪৮ শতাংশ জমির নামজারি জমা খারিজের শুনানিতে। দু’পক্ষের উপস্থিতিতে জাল কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে নারীসহ প্রতারক চক্রের পাঁচজনকে আটক করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। দুপুরে আটকদের ত্রিশাল থানা পুলিশে সোপর্দ করেন এই কর্মকর্তা।
আটকরা হলো- ধানীখোলা উজান ভাটিপাড়া গ্রামের ইসমাইল হোসেনের ছেলে শফিকুল ইসলাম, ইব্রাহিম খলিল, শরিফ উদ্দিন, শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা খাতুন ও শফিকুল ইসলামের স্ত্রী নাছিমা বেগম। বিকেলে ধানীখোলা ইউনিয়ন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মানিক কুমার সরকার বাদী হয়ে ত্রিশাল থানায় প্রতারকদের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেন।
জানা যায়, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মুনসুর আহমেদ, আবুল কালাম শামছুদ্দিন ও খান বাহাদুর ওসমান আলীদের উদ্যোগে ময়মনসিংহের ত্রিশালের ধানীখোলা ইউনিয়নে ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ধানীখোলা মিলন সমাজ ক্লাব। ধানীখোলা ইউনিয়ন পরিষদের নামে রেকর্ডভুক্ত ১২ একর জমির মধ্যে ২ একর ৬০ শতক জমি ১৯৬৩ সালে ইউনিয়ন পরিষদ রেজুলেশনের মাধ্যমে মিলন সমাজ ক্লাবে দান করা হয়। ওই জমির নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করত মিলন সমাজ ক্লাব। ২০০৮ সালে মিলন সমাজ ক্লাবের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ আদালতে মামলা করলে ২০১১ সালে তা খারিজ করে বাদীপক্ষকে অর্থদন্ড করেন আদালত। অভিযোগ উঠে এরপর প্রতিপক্ষ ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহায়তায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নসহ ওই তিন ভূমি অফিসের মূল ভলিয়মের কাগজ পাল্টাতে তারা সক্ষম হয়।
এদিকে ২০১৬ সালে ক্লাবের সভাপতি খাজনা দিতে গিয়ে জানতে পারেন ১৯নং খতিয়ানের ভলিউমের ১৯নং পাতাটি উধাও। প্রতারক চক্রটি চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ফের ২ একর ৪৮ শতাংশ জমির নামজারি জমা খারিজের আবেদন করে। এসিল্যান্ড সরেজমিন পরিদর্শন করে তাদের দখলে জমি না থাকায় আবেদনটি বাতিল করে দেন। প্রতারক চক্রটি এতেও হাল ছাড়েনি। গত অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তাকে দিয়ে খারিজ দেওয়ার সুপারিশ করলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবারও নথিগুলো পর্যালোচনা করতে বসেন। তার অফিসে সংরক্ষিত মূল ভলিউমের পাতা ছেঁড়া দেখে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহ হয়। তিনি ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট ও ভলিউম ঘাঁটেন। ক্লাবের নামে লিপিবদ্ধ জমির পরিমাণের পাতাটি উধাওয়ের পাশাপাশি ২২নং বইয়ের নতুন পাতা সংযোজনস্থলে প্রতারক চক্রের নাম পান। বিষয়টি যাচাই করতে গিয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা ও ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসকের এস এ শাখায় সংরক্ষিত কপিতেও ভয়াবহ জালিয়াতি ও অনিয়ম দেখতে পান এসিল্যান্ড।

সঠিক তথ্য যাচায়ইয়ের জন্য গত ১৮ নভেম্বর ময়মনসিংহ বিভাগীয় জোনাল অফিসে চিঠি পাঠান সহকারী কমিশনার (ভূমি)। জোনাল অফিসের তথ্যে তিনি জানতে পারেন, ভলিউমে জমিটির মূল মালিক হিসেবে ধানীখোলা মিলন সমাজ মাঠের নামে লিপিবদ্ধ। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানিয়ে মঙ্গলবার উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি জমা খারিজের শুনানির দিন ধার্য করেন এসিল্যান্ড। ওই চক্রের সঙ্গে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান ক্লাবের সভাপতি এমএ জলিল ফরাজী।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) তরিকুল ইসলাম তুষার বলেন, প্রতারক চক্রটি একশ্রেণির অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা ভূমি অফিসের রেকর্ডরুমের মূল ভলিউমের বই থেকে পাতা ছেঁড়া ও নকল কপি সংযোজনের কাজটি করেছে।
জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমান জানান, আটকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হয়েছে। মূল ভলিউমের কাগজ জালিয়াতির সঙ্গে যেসব অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত, দ্রæত তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।