বোরোর পাকা ধানে ব্লাস্টের আক্রমণ হাজারো কৃষকের সোনালী ধান এখন ‘ছিটা’!

অনলাইন ডেস্ক : ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণে হাজারো কৃষক দিশেহারা। রাত পোহালেই বাড়ছে আক্রমণ, ধরাশায়ী কৃষি বিভাগের প্রযুক্তি ও চিকিৎসাপত্র। পর্যাপ্ত পরিমাণ ছত্রাকনাশক দিয়েও ফসল রক্ষা করতে পারছেন না কৃষক। বর্গাচাষী কৃষকরা তিনধাপের ক্ষতির সম্মুখীন। ভাড়া করা জমির টাকা মালিককে দিতে হচ্ছে, সার, বীজ, কীটনাশক ও পানি খরচের কমতি নেই, রোগ প্রতিরোধের জন্য বাড়তি ছত্রাকনাশক দিয়েও শেষ পর্যন্ত ফসল রক্ষা হয়নি। দিনদিন বাড়ছে ছিটা ক্ষেতের সংখ্যা।

সরজমিনে গৌরীপুর পৌর শহরের সতিষা গ্রামে যাওয়ার পর মৃত আলাল উদ্দিনের পুত্র মো. মফিজ উদ্দিন জানান, ৯এপ্রিল তার জমিনের ফসল ভালো ছিলো। উপসহকারী কৃষি অফিসার মো. মোফাজ্জল হোসেনের পরামর্শে ছত্রাকনাশক দেয়ার পরেই মড়ক ধরে। ১১এপ্রিল সকালে গিয়ে দেখি ধানে ছিটা হয়ে যাচ্ছে। এক একর ৩০শতাংশ জমিনে মধ্যে ৬০শতাংশ জমিনে ব্রিধান ২৮ ও ৭০শতাংশ জমিনে ব্রিধান ৮৪ রোপন করেছিলাম। পুরো জমিনে এখন শুধু ছিটা! একই গ্রামের আব্দুল হামিদের পুত্র মো. রুকন উদ্দিনের ১১০শতাংশ, মৃত আব্দুল মালেকের পুত্র হাবিবুল্লাহ’র ১২০শতাংশ, মৃত জবেদ আলীর পুত্র হযরত আলীর ১৬০শতাংশ, মৃত আব্দুল মজিতের পুত্র মোবারক হোসেনের ৬০শতাংশ, মৃত জবেদ আলীর পুত্র আসমত আলীর ৮০শতাংশ, মৃত মোসলেম উদ্দিনের পুত্র মো. বাবুল মিয়ার ৭০শতাংশ, মৃত হেলাল উদ্দিনের পুত্র রফিক উল্লাহর ৮০শতাংশ, মৃত জাহের আলীর পুত্র তোতা মিয়অর ৭০শতাংশ, মৃত আমির উদ্দিনের পুত্র আব্দুল হাইয়ের ৩৫শতাংশ জমিনের ধান দেখলে মনে হয় পাকা, সন্নিকটে গেলেই বোঝা যায় পাকাধান নয়; এগুলো ‘ছিটা’ হয়ে গেছে।

অপরদিকে পৌর শহরের পুর্বদাপুনিয়ার মৃত আব্দুলের পুত্র সুজন মিয়ার ৪৫শতাংশ, মৃত ফয়েজ উদ্দিনের পুত্র আব্দুল গফুরের ৫০শতাংশ, রামগোপালপুর ইউনিয়নের ভবানীপুরে মৃত হযরত আলীর পুত্র মানিক মিয়ার ৮০শতাংশ, মৃত খায়রত আলীর পুত্র দুলার মিয়ার ১২০শতাংশ, সাক্তর আলীর পুত্র আব্বাস আলীর ৬০শতাংশ, গোপীনাথপুর গ্রামের মৃত কেরামত আলীর পুত্র মাওলানা আব্দুল গণির ৮০শতাংশ, রমজান আলীপুর পুত্র মো. আব্দুস সোবহানের ৬০শতাংশ, মো. আব্দুল মোতালেবের ৬০শতাংশ, আব্দুর রহিমের ৪০শতাংশ, মৃত আব্দুল হোসেনের পুত্র আহাম্মদ হোসেনের ৭২শতাংশ, মৃত আবাল হোসেন ফকিরের পুত্র মো. সাইফুল ইসলামের ৬০শতাংশ, বিশ^নাথপুর গ্রামের মৃত কিতাব আলীর পুত্র ফজলুল হকের ৬০শতাংশ, নয়াগাঁও গ্রামে ইসমত আলীর পুত্র মোখলেছুর রহমানের ৫০শতাংশ, উসমত আলীর পুত্র সাইদুর রহমানের ৫০শতাংশ, আসমত আলীর পুত্র তোতা মিয়ার ২ একর, আব্দুর রশিদের ৮০শতাংশ, হাসেন আলীর পুত্র আমিরুল ইসলামের ৬০শতাংশ জমিনের ব্রিধান ২৮জাতের ফসলি ধান ছিটা হয়ে গেছে।
এদিকে বোকাইনগর ইউনিয়নের অষ্টগড় গ্রামের আইয়ুব আলীর পুত্র মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের ৪০শতাংশ, অচিন্তপুর ইউনিয়নে ও সহনাটী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যা
য়, যেখানেই ব্রিধান-২৮ রোপন করা হয়েছে, সেখানেই ব্লাস্ট আক্রমণ করেছে। ২নং গৌরীপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর, গাভীশিম০ুল, বেকারকান্দা, মইলাকান্দা ইউনিয়নের শৌলগাই, টিকুরী, গোবিন্দপুর, বোকাইনগর ইউনিয়নের তেলিহাটি, ভাদেড়া গ্রামেও একই অবস্থা বিরাজ করছে।

অচিন্তপুর ইউনিয়নের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান টিটু জানান, তিনি রাতেও দেখে আসছেন। কোনো রোগবালাই নাই। সকালে ঘুম থেকে উঠে গিয়ে দেখেন, ধানের শীষে সব ছিটা হয়ে গেছে। শুধু তার নয় আশপাশের সব জমিনেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

লংক্ষাখোলা গ্রামের আব্দুল হাইয়ের পুত্র কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, তার ২একর ৫০শতাংশ জমিতে ব্লাস্টে আক্রমণ করেছে। জমিতে কাঁচি নিয়ে যাওয়ার অবস্থা নেই। তিনি আরো বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সহযোগিতা না করলে তাদের উপায় থাকবে না। এ গ্রামের আরফান আলীর পুত্র আব্দুল বারেকের ৭০শতাংশ, মৃত শহীদুল্লাহ’র পুত্র মো. শামীম মিয়ার ২একর, আব্দুল খালেকের এক একর, আব্দুল হাইয়ের পুত্র জোয়াদ উল্লাহ’র ৫০শতাংশ, মৃত ছাদরুল আমিনের পুত্র আবুল হাসেমের ৩০শতাংশ, আব্দুল মালেকের ৫০শতাংশ, মৃত জব্বর আলীর পুত্র বাচ্চু মিযঅর ৬০শতাংশ, মৃত আব্দুর রহমানের পুত্র রইছ উদ্দিনের ৩০শতাংশ, কাজল মিযঅর পুত্র মো. নাঈম মিযঅর ৪০শতাংশ, মৃত জমেদ আলীর পুত্র হেকিম মিয়ার ৩০শতাংশ, মৃত ছাবেদ আলীর পুত্র জমেদ আলীর ৬০শতাংশ, মৃত ইসমাইল হোসেনের পুত্র মিজানুর রহমানের ২০শতাংশ, চান মিযার পুত্র খোকন মিয়ার ৮০শতাংশ, মৃত জসীম উদ্দিনের পুত্র হুমায়ুন কবীরের ৬০শতাংশ, মোস্তাফিজুর রহমান টিটুর ১১০শতাংশ, মৃত আব্দুর রহমানের পুত্র হোসেন মিয়ার ৬০শতাংশ, মৃত হাসান আলীর পুত্র আব্দুস সাত্তারের ৫০শতাংশ, মৃত মকবুল হোসেনের পুত্র হাসেন আলীর এক একর ১০শতাংশ, আব্দুস সালামের ৭০শতাংশ, নুর ইসলামের ৬০শতাংশ এবং সাদেক মিয়অর ৭৫শতাংশ জমিতে ব্লাস্ট আক্রমণ করায় সব ধান ছিটা হয়ে গেছে।

কৃষক আজিবুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শক্রমে যত কীটনাশক দিচ্ছি, ক্ষেতের অবস্থা আরো খারা হচ্ছে। মৃত হাসেন আলী বলেন, কীটনাশকও কোনো কাজে আসছে না।

অপরদিকে সহনাটী ইউনিয়নের সোনাকান্দি, ধোপাজাঙ্গালিয়া, বোকাইনগর ইউনিয়নের বাংলাবাজার, নাহড়া, কিসমত বড়ভাগ এলাকায়ও ধানক্ষেতে ব্লাস্টে আক্রমণ করেছে। ধোপাজাঙ্গালিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান বুরহান জানান, তিনি রোববার সকালে গিয়ে দেখেন ৬০শতাংশ জমির ধান ব্লাস্টের কারণে ছিটা হয়ে গেছে।

উপজেলা কৃষি অফিসার লুৎফুন্নাহার জানান, এ বছর বোরো মৌসুমে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। বোরো আবাদ হয়েছে ২০হাজার ৪৩৫ হেক্টর। এ পর্যন্ত ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে ১৫ হেক্টর। তিনি আরো জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ব্লাস্টে আক্রান্ত জমির সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।

তিনি আরো জানান, ব্রিধান ২৮ জাতের ধানের ক্ষেতে মূলত ব্লাস্ট আক্রান্ত হয়েছে। এ ধান চাষে কৃষকদের নিরুসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়াও এ রোগ প্রতিরোধের জন্য কৃষকদের মাঝে লিফলেট ও চিকিৎসাপত্র দেয়া হচ্ছে।