নজরুল চর্চার তীর্থস্থান নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

ফারুক আহমেদ ও এম আর সবুজ,ত্রিশাল :
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার নিদর্শন স্বরূপ কবিকে সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে স্বীকৃতি দিয়ে কবির বাল্যস্মৃতি চিরঞ্জীব রাখার অভিপ্রায়ে ত্রিশালের নামাপাড়া গ্রামের ঐতিহাসিক বটতলায় ৫৭ একর ভুমির উপর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্বববিদ্যালয়। ঢাকা হতে ১০০ কিলোমিটার উত্তরে ময়মনসিংহ শহর হতে ২০ কিঃ মিঃ দক্ষিণে ত্রিশাল উপজেলার ত্রিশাল পৌর এলকার ১ নং ওয়ার্ডের নামাপাড়ায় অনাবিল, নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়টি অবস্থিত। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে এটি ৭ মে ২০০৬ তারিখে জাতীয় সংসদের ২১তম অধিবেশনে “জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়” আইন ২০০৬ পাস হওয়ার মাধ্যমে দেশের ২৭তম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও এখানে কেবল সাহিত্য, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন ও সংস্কৃতি সম্পর্কেই পাঠদান করা হবে না, এখানে জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে নিরলস গবেষণা চালানো হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোক সাহিত্য ও লোক-সংস্কৃতিক উন্নয়ন ও গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যতিক্রমধর্মী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য, ললিতকলা ইত্যাদি বিষয়ে যে পাঠদান করা হচ্ছে তাতে বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতি এক নতুনরূপে উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় যে ঐশ্বর্যমন্ডিত জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছেন তা আমাদের জাতীয় জীবনের এক পরম সম্পদ। তাই তাঁর সাহিত্যকর্মের গবেষণা মূল্যায়ন করা হলে বাংলাদেশের মর্যাদা ও তার গৌবর বৃদ্ধি পাবে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধনী ক্লাশ শুরু হয় ০৩ জুন ২০০৭ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, সংগীত বিভাগ এবং কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগসহ মোট চারটি বিভাগ নিয়ে। উদ্বোধনী শিক্ষাবর্ষে ২০০৬-২০০৭ সালে মোট ১৮৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে চারটি অনুষদের অধিনে তেইশটি বিষয়ে মোট ৭০৯৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বর্তমানে শিক্ষকগণের সংখ্যা প্রায় ১৯৫ এবং কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২৫০ জন। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও কর্মের উপর গবেষণা ও উচ্চতর শিক্ষার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত করা হয় ইন্সটিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ নামে একটি ইন্সটিটিউ। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ (অনার্স), বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং, বিএসসি (অনার্স), বিবিএ (অনার্স), এলএলবি (অনার্স), এমএ, এমএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং, এমএসসি, এম বিএ, ইএমবিএ,এমডিএস, এলএলএম, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রী চালু আছে। বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য কলা ও বিজ্ঞান নামে ০২টি পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবন রয়েছে, তাছাড়া সামাজিক বিজ্ঞান ও ব্যবসায় প্রশাসন এর জন্য ০২টি দশতলা বিশিষ্ট ভবন নির্মানাধীন রয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়ে পাঁচতলা বিশিষ্ট অগ্নি-বীণা ও দোলন-চাঁপা নামে দুইটি আবাসিক হল রয়েছে। তাছাড়া নির্মানাধিন রয়েছে ১০তলা বিশিষ্ট দুই হল। রয়েছে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সমৃদ্ধ সেন্ট্রাল লাইব্রেরী যাতে রয়েছে চল্লিশ হাজার বই। রয়েছে কম্পিউটার ল্যাব ও বিজ্ঞানাগার। থিয়েটার ও সংগীত বিভাগের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি। কবির ব্যাথার দান নামক কাব্য গ্রন্থের নামে রয়েছে একটি একতলা বিশিষ্ট একটি মেডিকেল সেন্টার যেখানে পরীক্ষার নিরিক্ষার জন্য রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। বিশ^বিদ্যালয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-চির উন্নত মম শির। নির্মাণাধীন রয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের দুটি ভাস্কর্য, তাছাড়া রয়েছে স্বাধীনতা স্তম্ভ, জয়বাংলা ভাস্কর্য, শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য রয়েছে সুবিশাল কেন্দ্রীয় শেখ রাসেল খেলার মাঠ। পুকুরের মাঝে রয়েছে মনমুগ্ধকর প্রমোদতরি সিন্ধু সারস। বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালনের জন্য রয়েছে গাহি সাম্যের গাণ মুক্ত মঞ্চ, চুরুলিয়া মঞ্চ, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছাতা দিয়ে তৈরী গোল চত্বর, তাছাড়া রয়েছে ভার্সুয়াল কনফারেন্স রোম, যেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিশ^বিদ্যালয়ে রয়েছে একটি আকর্ষনীয় ক্যাফেটরিয়া। রয়েছে কেন্দ্রীয় মসজিদ, একটি প্রাইমারী স্কুল। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য যাতায়াতের জন্য নিজস্ব বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও ভাড়া করা বাস। জরুরী রোগী আনা নেয়ার জন্য রয়েছে একটি এ্যাম্বুলেন্স। ২০১৯-২০২০ শিক্ষাবর্ষে ৫টি ইউনিটে মোট ২৩টি বিষয়ে ১৭ নভেম্বর থেকে ভর্তি পরীক্ষা শুরু হয়ে ২১ নভেম্বর শেষ হবে। এ ইউনিটভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, দর্শন বিভাগ বি ইউনিটভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং পরিসংখ্যান বিভাগ, সি ইউনিটভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজম্যান্ট বিভাগ এবং ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, ডি ইউনিটভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-অর্থনীতি বিভাগ, লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালন বিদ্যা বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ, ফোকলোর বিভাগ, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ, স্থানীয় সরকার ও নগর উন্নয়ন বিভাগ এবং সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ই ইউনিটভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে-সংগীত বিভাগ, চারুকলা বিভাগ, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ এবং ফিল্ম এন্ড মিডিয়া বিভাগ। উক্ত বিভাগসমূহে ভর্তির জন্য প্রায় ৩৫ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়েছে। আসন প্রতি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩ জন।,

বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য দেশবরেণ্য সমাজবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমানের দক্ষ নেতৃত্ব ও ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠায় আন্তর্জাতিক মানের অনেক বিশ^বিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময় চুক্তি সাধনের ফলে গুনগত মান বৃদ্ধির চেষ্টা যেমন অব্যাহত রয়েছে তেমনি স্বাধীনতার চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বিনিমাণে আগামীকে আরও সুন্দর করার প্রয়াসে কাজ করে যাচ্ছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি। যিনি একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। তিনি যোগদানের পর ০৪টি নতুন বিভাগ চালু করেছেন। দায়িত্ব গ্রহনের পর বিশ^বিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে শতভাগ দুনীতিমুক্ত করেছেন। তাছাড়া তাঁর প্রচেষ্টায় বিশ^বিদ্যালয়ে ৪৯১ কোটি টাকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে।
দেশবরেণ্য সমাজবিজ্ঞানীর ছোঁয়ায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠুক বিশ্বের অন্যতম বিশ্বববিদ্যালয় গুলোর একটি এমনটিই প্রত্যাশা ময়মনসিংহবাসীর ।