দূর্গা সাগর পর্যটকদের আকর্ষণ

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশার দূর্গাসাগর দিঘি এখনো দেশ-বিদেশের বিভিন্নস্থান থেকে আসা পর্যটকদের সর্বক্ষণ নজর কারে। ভ্রমণ পিপাসুরা এই দিঘির পাড়ে এসে একটু জিরিয়ে মনে-প্রাণে ভিন্ন মাত্রার শান্তিও খুঁজে পান তারা। অনেকেই নগর জীবনের কোলাহল জঞ্জাল থেকে সাময়িক মুক্তি লাভের জন্যও এ দিঘির পাড়ে প্রকৃতির মাঝে কিছুটা সময় কাটিয়ে মনকে প্রফুল্ল করেন। বিশাল এ দিঘির মধ্যস্থানে তৈরি করা হয়েছে একটি কৃত্রিম দ্বীপ। এখানে এসে দেশ-বিদেশের শীতের পরিযায়ী পাখিরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নেন। তবে প্রাকৃতিক আবহাওয়ার কারণে গত কয়েক বছর ধরে এ দিঘিতে পাখিদের আগমন অনেকটা কমে গেছে।

প্রায় ৭৭ একর জমি নিয়ে দূর্গাসাগর দিঘিটি সমগ্র দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহত একটি বদ্ধ জলাশয়। ১৯৭৪ সালে দিঘিটি পুনঃখনন করে বর্তমান রূপ এনে দেয়া হয়। দিঘির মাঝে থাকা কৃত্রিম দ্বীপটিও সে সময়ে তৈরি করা হয়। দিঘিটি খনন করতে গিয়ে সেসময় উদ্ধার হয়েছিল বিশালাকৃতির ঘোড়ার কষ্টিমূর্তি। সেটি এখন বর্তমানে বরিশাল জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৯৭৪ সালে দূর্গাসাগর দিঘি পুনঃখননের সময় পাড় বাধাই সহ পশ্চিম পাড়ে একটি ছোট বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৮-৯৯ সালে দিঘির সীমানা নির্ধারণ করে প্রাচীর ও গেট নির্মাণ করা হয়। এখানে প্রবেশে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বর্তমানে জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত নামমাত্র প্রবেশমূল্যের বিনিময়ে দিঘিটিতে প্রবেশের অনুমোদন মেলে।

দূর্গাসাগর দিঘিকে ঘিরে সাবেক পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন কিছু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে গেছেন। ইতোমধ্যে সে প্রকল্প মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন শেষে অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরুর পর্যায়ে রয়েছে। ২০২১ এর জুনের মধ্যে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দূর্গাসাগরে বিশ্রামাগার, রেস্টুরেন্ট, পিকনিক স্পট নির্মাণ ছাড়াও পুরনো ঘাটনাগুলো সংস্কার ও পুনঃনির্মান করা হবে। সম্পূর্ণ পরিবেশ বান্ধব একটি বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে দূর্গাসাগর দিঘি।

প্রাথমিকভাবে দিঘিটির পূর্ব ও দক্ষিণ পাড়কে ঘিরে এসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এজন্য জেলা প্রশাসন থেকে প্রয়োজনীয় জমিও পর্যটন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করেছে। দূর্গাসগরের প্রকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে এখানে পর্যটন উপযোগী উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়িত হবে বলে দাবি করেছন পর্যটন করপোরেশনের দায়িত্বশীল মহল।

সতের’শ সালের শেষ দিকে তৎকালীন বাকেরগঞ্জ বা বাকলা চন্দ্রদ্বীপ রাজ বংশের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়নের মৃত্যুর পরে জেষ্ঠপুত্র লক্ষ্মী নারায়ন রাজত্বভার গ্রহণ করলেও কিছুদিন পর তারও অকাল মৃত্যু ঘটে। ফলে রাণি দূর্গাবতি নিজেই রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রজাদের কল্যাণের জন্য বিভিন্ন জনহিতকর কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তারই অংশ হিসেবে প্রজাদের সুপেয় পানির কষ্ট লাঘবের লক্ষে বর্তমান বরিশাল মহানগরী থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মাধবপাশায় ৭৭ একর জমি নিয়ে একটি দিঘি খনন করেন। খননের পরেই রানির নামানুসারেই ঐ বদ্ধ জলাশয়ের নামকরন করা হয় ‘দূর্গাসাগর দিঘি’। সেই থেকে ঐ এলাকার প্রজা সাধারণ দূর্গাসাগরের পানি পান করে জীবন ধারণ করে আসছিলেন। তবে কালের বিবর্তনে রাজবংশের পতনের ফলে সে দিঘি আর সংরক্ষণ না হওয়ায় একসময়ে তা পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ফলে সে সময়কালে এদেশ থেকে জমিদারী প্রথারও বিলুপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে পুরো দূর্গাসাগর দিঘি সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত হয়ে যায়। স্বাধীনতার পরপরই নতুন করে সংস্কারের ফলে দূর্গাসাগর দিঘি আবার তার পুরনো রূপ ফিরে পায়। যা ইতোমধ্যে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বরিশাল মহানগরীর কেন্দ্রীয় বাসস্ট্যান্ড থেকে বানরীপাড়া ছারছিনা-নেছারাবাদগামী বাস বা থ্রীহুইলারে করে মাত্র বিশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় দূর্গাসাগর দিঘির পশ্চিম পাড়ের প্রধান ফটকে। সেখানে গিয়ে টিকেট সংগ্রহ করেই ভেতরে প্রবেশ করে ঘুরে বেড়ানো যাবে দূর্গাসাগরের চারিপাশ। এমনকি দিঘির ঘাটলায় গোসলও কারা যায়। তবে এক্ষেত্রে শিশু, নারী ও সাঁতার না জানা যে কাউকে দিঘির পানিতে নামতে নিষেধ করার কথা রয়েছে। কিন্তু সে বিধি নিষেধ অমান্য করে অনেকেই আবার বেকায়দায়ও পড়েন।

তবে এসব কিছুর পরেও দূর্গাসাগর এখনো পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত একটি আকর্ষণীয় স্থান। প্রকৃতির মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলতে শহরের অশান্তি কোলাহল ছেড়ে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষ ছুটে আসছেন বরিশালের দূর্গাসাগর দিঘির পাড় এলাকায়। ছায়া সুনিবিড় পরিবেশে পাখির কলকাকলিতে মন হারিয়ে যায় প্রকৃতির মাঝে। দূর্গাসাগর থেকে আরো ১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে তৎকালীন বাংলার বাঘ খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক এর পৈত্রিক নিবাস। তার প্রতিষ্ঠিত কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । এখানে রয়েছে শেরে বাংলা জাদুঘর। সেখানে শেরে বাংলা ও তার বংশের অনেক সামগ্রী রক্ষিত রয়েছে। এখানে আরো আছে দক্ষিণাঞ্চলের আরো বেশ কিছু প্রত্নতত্ব নিদর্শনও। এই দূর্গাসাগর এলাকায় যারাই আসেন তারাই একই সঙ্গে শেরে বাংলা জাদুঘরে ঘুড়ে বেড়িয়ে যায়।