ত্রিশালে ৩দিন ব্যাপী মাদার পীরের ওরশ সম্পন্ন

ফারুক আহমেদ :
ময়মনসিহের ত্রিশাল উপজেলার কাঁঠাল ইউনিয়নের বানিয়া ধলা গ্রামে শত শত বছর আগে থেকে পালন করে আসা এবারো তিন দিন ব্যাপী বাৎসরিক ওরস মোবারক পালন করা হয়েছে। স্থানীয় সমাজ সেবক ও মাজার শরীফের প্রধান খাদেম জসীম উদ্দীন উদ্যোগে জাহিদ ফাউন্ডেশনের সহযোগীতায় ৬ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার বিকেলে ৩দিন ব্যাপী ওরস মোবারক উদ্বোধন করা হয়। দরগার সভাপতি মিজানুর রহমান ফকিরের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ফজলে রাব্বী। বিশেষ অতিথি ছিলেন, প্রফেসর ড.ফরিদুল আলম, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, দরগার প্রধান খাদেম জসিম উদ্দিন। অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন,কালির বাজার বণিক সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, ইউপি সদস্য সুরুজ আলী, দরগার উপদেষ্ঠা আবুল কালমসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। ৬জানুয়ারী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই ওরস মোবারকের প্রথম দিবসের কার্যক্রম শুরু হয়ে ৮ জানুয়ারী ২০২১ইং দিবাগত রাত শেষ প্রহরে মোনাজাত ও সমাপনী করা হয় । এসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাদারিয়া গান নিয়ে ছুটে আসেন অনেক দল। লাখো আশেকানদের উপস্থিতি হালকা ঝিকির, মাদারিয়া গানের আসর এলাকা জুড়েই ধর্মীয় মাদারী আজম সৌরভ ছড়িয়ে পরে। দ্বিতীয় দিনেও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও হাজার হাজার ভক্ত। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও বাউল গান আর ঝিকিরে সৌরভ মাদারী পীরের রেওয়াজ ছড়িয়েছে এলাকায়। এই মাদারিয়া তরিকা উত্তর ভারত, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ, মেওয়াত অঞ্চল, বিহার, গুজরাত ও পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয় এবংএকইসাথে নেপাল,বাংলাদেশেও জনপ্রিয় সুফি তরিকা, যা প্রচলিত প্রথা ভাঙা, বাহ্যিক ধর্মীয় অনুশীলনের উপর শিথিলতা এবং আত্ম যিকিরের উপর জোর প্রয়োগের করনে সুপরিচিত। এই পীরের নামেও নাকি বাংলাদেশে একটি জেলার নাম করণ করা হয়েছে। বাংলাদেশে বহু অঞ্চলে প্রখ্যাত সুফি সাধক সৈয়দ বদিউদ্দীন জিন্দা শাহ মাদার এর ভক্ত রয়েছেন। বাংলাদেশে মাদার শাহ পীরের সবচেয়ে বড় ওরশ হয় মাদারীপুর। ময়মনসিংহের ত্রিশালেও যুগ যুগ ধরে এই পীরের ওরশ হয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মানুষের উপস্থিতি এক মহা জনসমুদ্র সৃষ্টি হয়। (মৃত্যু ১৪৩৩খ্রি:) কর্তৃক প্রবর্তিত সূফি তরিকা এবং উত্তর প্রদেশের কানপুর জেলার মকানপুরে তার মাজার কেন্দ্রিক পরিচালিত তরিকা। তিনি ১৩ শতকে আশরাফ জাহাঙ্গীর সেমনাণী সহ ভারতে আগমন করেন।

তাঁর পীর বা আধ্যাত্মিক তাঁর পীর বা আধ্যাত্মিক শিক্ষক বায়াজীদ তাঁয়ফুর আল-বোস্তামি কর্তৃক প্রবর্তিত তৈয়ফুরিয়া তরিকা থেকে উৎপত্তি হয়ে মাদারিয়া তরিকা ১৫ থেকে ১৭ শতকের মাঝামাঝি মুঘল আমলে বিশেষ গৌরব অর্জন করেছিল এবং শাহ মাদারের শিষ্যদের মাধ্যমে ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা, বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এ তরিকা ছড়িয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সুফি তরিকার মতই এটি প্রতিষ্ঠাতা শাহ মাদারের নামে নির্মিত হয়েছে, যা মাদারিয়া তরিকা নামে পরিচিত।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, মাদার পীরের প্রকৃত নাম হলো বদিউদ্দিনশাহ মাদার আর তার অনুসারীদে বলা হয় মাদারিয়া। মাদারের আরও একটি ভালো নাম আছে, কুতুব-ই-জাহান, হযরত সৈয়দ বদিউদ্দিন আহমেদ জিন্দা শাহ মাদার (৮৫৭-১৪৩৪) খ্রিস্টাব্দে ছিলেন প্রখ্যাত অধ্যাতিক সুফি সাধক যিনি মাদারিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।তিনি কুতুব-উল-মাদার নামেও পরিচিত।

মাদারের পরিচয়ঃ শাহ মাদারের পিতার নাম সৈয়দ আলী হাবানি এবং মাতার নাম ফাতেমা সানিয়া। মাদারের পিতা ও মাতার নাম বিভিন্ন স্থানে নামের বানানে উপস্থাপন করা হয়েছে।

মাদারের জন্মঃ মাদারের জন্মস্থান আরব জাহানের পার্শ্ববর্তী তৎকালিন শাম রাজ্যের (বর্তমানে সিরিয়া) হলব নামক স্থানে ২৪২ হিজরি সনে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে সভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ।তার পিতার নাম সৈয়দ কুদওয়াত উদ্দীন আলী আল-হাল্বী ও তার মা ছিলেন সৈয়দা ফাতিমা সানিয়া। তার পিতা ইমাম হোসেনের বংশধর এবং মা ইমাম হাসানের বংশধর। সে হিসেবে তিনি আল-হাসানি-ওয়াল-হোসাইনি।

অন্য স্থানে বলা হয়েছে, শাহ্ মাদার একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি । তার প্রকৃত নাম বদিউদ্দিন লবকুতুবে মাদার। আবার অনেকে মনে করেন, তিনি ৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জানুয়ারী (২৪২ হিজরি ১ শওয়াল)সিরিয়ার শামদেশে একপ্রান্তে অবস্থিত হলব নামক শহরে জন্মগ্রহহণ করেন। আবার কোথাও কোথাও তার জন্ম ১০১৫ খ্রিস্টাব্দে (৩০০ হিজরি) হয়েছিল বলে উল্লেখ আছে। আবার কোন কোন কিতাবে তার জন্ম ৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে (১৮২ হিজরি)।শাহ্ মাদারের মৃত্যু ১৪৩৬ খ্রিস্টাব্দে বলে সৈয়দ জামিল আহমেদ উল্লেখ করেছেন তবে, শাহ্ মাদারের জন্ম সম্পর্কে ওয়াকিল আহমদ এবং গিরীন্দ্রনাথ দাস অভিন্ন মত পোষন করেন। অঞ্চল ভেদে শাহ মাদার, দম মাদার ও মাদার পীর বলে অভিহিত হয়। মাদার পীরের মাজার বা রওজা শরিফ বা বদিউদ্দীন শাহ মাদারের সমাধি ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুর শহরের কাছে মকানপুরে অবস্থিত। এখানে প্রতি মাসে বিশেষ করে বার্ষিক ওরস উৎযাপনের সময় হাজার হাজার দর্শনার্থী, ভক্তবৃন্দ
পরিদর্শন করে।

বায়জীদ তায়ফুর আল-বোস্তামী ছিলেন তার পীর বা আধ্যাত্মিক শিক্ষক। মাদারিয়া তরিকা ১৫ থেকে ১৭ শতকের মাঝামাঝি মুঘল আমলে বিশেষ গৌরব অর্জন করেছিল।

মাদারের বংশ পরিচয়ঃ শাহ্ মাদারের বংশ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত প্রচলিত আছে। অনেকে বলেন, তিনি কোরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, তিনি বনি ইসরাইল গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদ আহাম্মদ আব্বাছী ছাফিনাতুল আউলিয়া ও তাজকেরাতুল কেরাম নামক এক গ্রন্থে উল্লেখিত তথ্য থেকে মনে করেন যে, তিনি হাশিমী বংশের বনি ফাতেমা গোত্রের লোক ছিলেন। ছাফিনাতুল আউলিয়া কিতাব থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও শাহ্ মাদারের পিতৃ ও মাতৃ বংশ সম্পর্কে জানা যায়।

মাদারের পিতার বংশ পরিচয়ঃ মাদার-ই-আযম কেতাব থেকে জানা যায়, সৈয়দ বদিউদ্দিন অর্থ্যাৎ মাদারের পিতা ছিলেন, সৈয়দ আলী হাবানি। তার পিতা ছিলেন বাহাউদ্দিন। তিনি ছিলেন জহীরুদ্দিনের পুত্র, সৈয়দ জহীরুদ্দিনের পিতা সৈয়দ আহমদ তার পিতার নাম সৈয়দ ইসমাইল। তিনি ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদের পুত্র। তার পিতা ছিলেন ইসমাইল সানি। তার পিতা ইমাম জাফর সাদেক। তার পিতা ইমাম ইবনে বাকের। ইমাম ইবনে বাকেরের পিতা ইমাম জয়নাল আবেদিন। তার পিতা ছিলেন শহীদে কারবালা ইমাম হোসাইন। তার পিতা আমিরুল মোমেনিন সৈয়দ আলী। তার পিতা ছিলেন, আবু তালেব হাশেমী। তার পিতা ছিলেন, আবদুল মোত্তালিব। তার পিতা আমীরুল আলা যিনি হাশেমী বংশের লকবের অধিকারী ছিলেন।

মাদারের মাতার বংশ পরিচয়ঃ শাহ মাদারের মাতার নাম ফাতেমা সানিয়া। তার পিতার নাম সৈয়দ আব্দুল-আহর । তার পিতা সৈয়দ জাহেদ। তার পিতা সৈয়দ মোহাম্মদ। সৈয়দ মোহাম্মদ ছিলেন সৈয়দ আবেদের পুত্র। তিনি ছিলেন সৈয়দ সলেহের পুত্র। সৈয়দ সালেহের পিতা ছিলেন, আবু ইউসুফ।
এই মাদার শাহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জায়গায় মানুষ হৃতয় জয় করে মানুষের হৃদয়ে জেগে আছেন। প্রতি বছর বিভিন্ন অঞ্চলে এই মাদার শাহ স্বরণে ওরশ মোবারক হয়ে আসছে এবং আগামীতেও হবে এটাই চির সত্য।