ত্রিশালে মৎস্য বিপ্লব

ফারুক আহমেদ :
মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের মৎস্য চাষিরা। দেশের শতকরা ২২ ভাগ মাছ উৎপাদন হয় ময়মনসিংহ জেলায়। আর এর সিংহভাগই উৎপাদন হয় ত্রিশালে। উপজেলায় মাছের মোট উৎপাদন ৮৫,১২২ মে. টন। উপজেলায় মাছের চাহিদা ৮,২২০ মে.টন এবং উপজেলায় মাছ উদ্বৃত্ত ৭৬,৯০২ মে. টন।

ত্রিশাল উপজেলার আয়তন ৩৩৮.৭৩ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা ৩৩৬৭৯৭। একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে ত্রিশাল উপজেলা গঠিত। উপজেলায় সরকারি পুকুরের সংখ্যা ৫টি, যার আয়তন ১৩৪ হেক্টর। বেসরকারি পুকুরের সংখ্যা ২৪৪৯৮টি, যার আয়তন ৩১২৫ হেক্টর। এছাড়া সরকারি হ্যাচারি একটি এবং বেসরকারি মৎস্য হ্যাচারির সংখ্যা ৩৮টি।

এ উপজেলায় সরকারি হিসেব মতে, খালের সংখ্যা ২০টি, যার আয়তন ৪২ হেক্টর। বিলের সংখ্যা ৩৭টি, যার আয়তন ৯শ’ হেক্টর এবং নদীর সংখ্যা ৭টি, যার আয়তন ১২৩২ হেক্টর। মৎস্য নার্সারির সংখ্যা ১১০টি, মৎস্য খাদ্য কারখানা একটি, মৎস্যখাদ্য বিক্রয়কারি প্রতিষ্ঠান খুচরা ৬৪টি ও পাইকারি ৬টি। মৎস্য খাদ্য আমদানিকারকের সংখ্যা ১ জন, ক্রাশিং মিলের সংখ্যা ২৮টি, মৎস্যজীবির সংখ্যা ৩৩০৯ জন, মৎস্য আড়তের সংখ্যা ১৯টি, বরফ কলের সংখ্যা ৮টি।

উপজেলা মৎস্য অফিসের অধীনে দুটি মৎস্য প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো- ন্যাশনাল টেকনোলজি প্রজেক্ট (এন.এ.টিপি-২) এবং ইউনিয়ন মৎস্য চাষ প্রকল্প। প্রকল্পগুলোতে একজন সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, দুইজন ক্ষেত্র সহকারি এবং ১২টি ইউনিয়নে দুই প্রকল্পের দুইজন করে ২৪ জন স্থানীয় মৎস্য সম্প্রসারণ প্রতিনিধি রয়েছেন। উপজেলায় ধান ও সবজি চষের পাশাপাশি পাল্লা চলছে মাছ চাষ।

তবে মাছ চাষিদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে তারা দামে কিছুটা কম পাচ্ছেন। তাছাড়া বিদেশে সরাসরি মাছ রপ্তানি প্রক্রিয়া না থাকায় চাষিরা আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে বিদেশে মাছ রপ্তানির জন্য ভার্গো ও সেভেন ওসান নামক দুটি বেসকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

পৌর শহরের ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে দেশীয় প্রজাতির মাছ ও পাঙ্গাস মাছের জন্য দুটি পৃথক মৎস্য আড়তে প্রতিদিন টনকে টন মাছ বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিক্রি চলে বেলা ১১টা পর্যন্ত। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাইকারদের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে এই মাছগুলো।

দেশীয় প্রজাতির মাছের ‘দয়াল নবী মৎস্য আড়ত’র প্রোপ্রাইটর আবুল মুনসুর জানান, এ মৎস্য আড়ৎ থেকে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ টন মাছ বিক্রি হচ্ছে। এর আনুমানিক মূল্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা।

অপরদিকে পাঙ্গাস মৎস্য আড়তের প্রগতি ফিস কমিশন এজেন্টের প্রোপ্রাইটর তাজুল ইসলাম গং জানান, এ আড়ৎ থেকে ৮০ থেকে ৯০ টন মাছ বিক্রি হচ্ছে। এর আনুমানিক মূল্য ৬৫ থেকে ৭৩ লাখ টাকা।

উপজেলার সদর ইউনিয়নের ছলিমপুর গ্রামের মাহাবুব মৎস্য হ্যাচারি এন্ড ফিসারিজের প্রোপ্রাইটর খাইরুল বাসার মাহাবুব বলেন, আমার হ্যাচারিতে শিং, পাবদা, গুলশা, টেংরা, মাগুর ও দেশীয় প্রজাতির সকল প্রকার রেনু ও পোনা বিক্রয় করা হয়। রেনু ও পোনার গুণগত মান ভালো হওয়ায় ত্রিশালসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষিরা আমার হ্যাচারিতে আসে এবং রেনু ও পেনা কিনে চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের মৎস্য চাষি আশিক আহমেদ জানান, মৎস্য খাদ্যের দাম দিন দিন বৃদ্ধির ফলে মাছ চাষে বর্তমানে কৃষকের লাভের পরিমাণ কম হচ্ছে। সরকার যদি মৎস্য খাদ্যের দাম নির্ধারণ করে দেয়, তবে মৎস্য চষিরা লাভবান হবে বলে আমি মনে করি। তাছাড়া সরকার যদি মৎস্য ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে, তবে প্রান্তিক মৎস্য চাষিরা মাছ চাষে আরো উৎসাহী হবেন।

উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদ জানান, এন.এ টিপি প্রজেক্টের আওতায় ত্রিশালে একটি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। যার নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। এটি নির্মাণ শেষ হলে মৎস্য চাষিরা অনলাইনে সরাসরি তাদের উৎপাদিত মাছ বিক্রি করতে পারবেন এবং তারা লাভবান হবেন।

তিনি আরও বলেন, মাছ চাষে ত্রিশাল একটি মডেল উপজেলা। উপজেলা মৎস্য অফিসসের সঠিক তদারকির কারণে ত্রিশালে মাছ চাষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। ত্রিশাল থেকে মাছ সরাসরি এবং পাইকার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে।