তারপরেও আজ পয়লা বৈশাখ

আজ ভোরে রমনা বটমূলে বৈশাখকে বরণ করবেন না ছায়ানটের শিল্পীরা, আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বেরোবে না কোনো মঙ্গল শোভাযাত্রা, আজ পান্তা-ইলিশের কোনো ধুম পড়বে না, আজ রঙিন শাড়িতে সেজেগুজে আমাদের লাবণ্যময়ীরা পুরো দেশ মাতাবেন না, আজ নতুন পাঞ্জাবিতে উচ্ছাসভরা তারুণ্য ছড়াবে না সারাদেশে- তারপরেও আজ পয়লা বৈশাখ।

পয়লা বৈশাখ বাঙালির বর্ষবরণের দিন, বাঙালির নতুন বছরকে অবগাহনের দিন, পয়লা বৈশাখ হলো ঋতু পরিবর্তনের দিন। আমরা একটি নতুন ঋতুকে বরণ করে নিচ্ছি, নতুন বছরে আমাদের বছরে প্রথম মাস বৈশাখ। এখান থেকেই আমাদের গ্রীষ্মের সূচনা। আর পয়লা বৈশাখে আমাদের যে আনুষ্ঠানিকতা, আমাদের যে উৎসব, সেই উৎসবের আড়ালে প্রকৃতিরও একটি আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, প্রকৃতির একদম নিজের একটি উৎসবও রয়েছে। সেটা আমাদের অনেকেরই বোধগম্য নয়।

আমরা আমাদের নাগরিকজীবন এবং গ্রামীণ জীবনেও পয়লা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতার শেকলে বন্দি করে ফেলেছিলাম। পয়লা বৈশাখ মানে আমাদের কাছে পান্তা-ইলিশের ধুম, পয়লা বৈশাখ মানে মেলায় যাইরে, পয়লা বৈশাখ মানে গানের উৎসব, সারা শহর ঘুরে বেড়ানো, ফুলে ফুলে সুরভিত আমাদের নাগরিক জীবন।

কিন্তু এবার যখন এই সবকিছু থেকে আমরা দূরে, করোনার করাল ছোবলের কারণে আমাদের পয়লা বৈশাখে আনুষ্ঠানিকতার কোনো আমেজ নেই, উৎসবের আনন্দ নেই, নেই আমাদের প্রচলিত নববর্ষকে বরণ করার কোনো আয়োজন। কিন্তু তারপরেও আমাদের পয়লা বৈশাখ, আমাদের বর্ষবরণ, আমাদের প্রাণের মেলার উৎসব, আমাদের প্রকৃতির উৎসব।

আজ পয়লা বৈশাখে যখন উৎসব আনন্দমুখর থাকবে না দেশ, তখনো গাছ থেকে ঝরা পাতা পড়বে, নতুন পাতার উদ্ভাস দেখবো আমরা বৃক্ষের পাতায় পাতায়।

আজ পয়লা বৈশাখে আমরা দেখবো প্রকৃতির দূষণমুক্ত বাতাস, যেই বাতাসে অবগাহন করবে কতই না অত্যাচারে অতিষ্ট গৃহবন্দি পাখিরা। সেই পাখিরা আজ গান গাইবে, তাদের কিচিরমিচিরে মুখরিত হবে চারিদিক।

আজ এই দিনে দূষণের হাত থেকে মুক্ত আমাদের বৃক্ষগুলো যেন আনন্দে সামিল হবে। তারাই যেন এসো হে বৈশাখ গানে নিজেদের উৎসব করবে।

আজ কোনো মানবিক ‍উৎসব হবে না, আড়ম্বড়তা হবে না, মঙ্গল শোভাযাত্রা হবে না, হবে না রমনা বটমূলের সঙ্গীতায়োজন। কিন্তু আজ যেন প্রকৃতি উৎসব করবে। আজ নদীর কলতানের মধ্যে আমরা শুনবো বৈশাখের বার্তা। পাখিদের কলতানে শুনবো নতুন বর্ষকে বরণ করে নেওয়ার ব্যস্ততা।

পয়লা বৈশাখ আসলে প্রকৃতিরই উৎসব। আমরা মানুষেরা প্রকৃতিকে ঘরে বন্দি করে, প্রকৃতিকে নির্যাতন করে আমরা উৎসব করে এসেছি এতদিন ধরে। আজ যেন প্রতিশোধের দিন। আজ পয়লা বৈশাখ, নতুন বর্ষবরণ করবে আমাদের প্রকৃতি, আর আমরা ঘরে বসে থাকবো। তারপরও হোক না, এটা হোক আমাদেরই বর্ষবরণ, আমাদের প্রাণের উৎসব। যে প্রকৃতির জন্যই আমরা টিকে আছি, সেই প্রকৃতিই করুক এবার প্রাণের উৎসব। আমরা না হয় এবার ঘরেই থাকি।