করোনা সংকট উত্তরণে জোরালো-সুসমন্বিত বৈশ্বিক সাড়া দরকার: প্রধানমন্ত্রী

কোভিড-১৯ মহামারির এই সংকট মোকাবিলায় এখনই সব দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ সংস্থা ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে একটি জোরালো, সু-সমন্বিত এবং বৈশ্বিক সাড়া প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার (৮ জুলাই) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আইএলও আয়োজিত ‘গ্লোবাল লিডার’স ডে’ ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে দেওয়া ভিডিওবার্তায় এ আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। করোনা মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সংকটগুলো উত্তরণের জন্য তিনটি প্রস্তাবও দেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি মোকাবিলায় এখনই সব দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ সংস্থা ও বেসরকারিখাতের অংশগ্রহণে সারা বিশ্বে একটি জোরালো এবং সু-সমন্বিত সাড়া প্রয়োজন। যেখানে জি-৭, জি -২০, ওইসিডি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় এ সংকট উত্তরণে সব ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বতন্ত্রভাবে সবার জন্য উপযুক্ত কাজের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন কিন্তু আমরা সবাই একত্রে এটি করতে পারি।

কোভিড-১৯ মহামারির থাবায় ক্ষতির কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এই বৈশ্বিক দুর্যোগ বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা আমাদের বিশ্বায়ন ও কানেকটিভিটিকে হুমকিতে ফেলেছে।

তিনি বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি এখন কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয় বরং এটি এখন পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এই মহামারিতে আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আমরা বিলিয়ন বিলয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশ হারিয়েছি, আমাদের অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, লাখ লাখ শ্রমিক তাদের চাকরি হারিয়েছে।

‘আমাদের ক্ষুদ্র শিল্পগুলো তার বেশির ভাগ সম্পদ ও বাজার হারিয়েছে এবং সর্বোপরি সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় আমাদের কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়। ’

এই মহামারিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসটি সংক্রমণের ক্ষেত্রে কোনোরকম বৈষম্যমূলক আচরণ না করেই কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। তবে এর বিরূপ প্রভাবগুলো দুর্বল, অভিবাসী ও নারী শ্রমিকদের ওপর বেশি পড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচারণ করছে।

চলমান করোনা সংকটে শ্রমিক সমস্যাগুলো উত্তরণে তিনটি প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

১. এই সংকটের সময় বিদেশের বাজারে অভিবাসী শ্রমিকদের চাকরি বহাল রাখতে হবে।

২. যদি অব্যাহতি দিতেই হয় তবে শ্রমিকদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সুবিধাসহ ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য বরখাস্ত সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

৩. মহামারির পরে অর্থনীতিকে সক্রিয় করতে এই কর্মীদের পুনরায় নিয়োগ দিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি বিভিন্ন দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, বিশেষ করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমিকরা।

উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে এবং যার ফলে রেমিট্যান্সে ঘাটতি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রেমিট্যান্স আমাদের মূল উপাদান।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বেকার অভিবাসী শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তন একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ভবিষ্যৎবাণী করেছে আমরা ২০ শতাংশের বেশি রেমিট্যান্স আয় হারাবো।

শর্তবর্ষ উপলক্ষে আইএলও– এর ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সেখানে আমরা সবাই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, জনসংখ্যার পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বায়নের মাধ্যমে বিশ্বকে বদলে দেওয়ার কথা বলেছিলাম।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বাংলাদেশের আশ্রয়ে থাকা মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

করোনা মহামারি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি সংকট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রণোদনা হিসেবে অর্থনৈতিক ও সমাজের বিভিন্ন সেক্টরের মানুষকে সহযোগিতা করতে ১২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করি। এই সহায়তা প্যাকেজ আমাদের জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশের সমান।

তিনি বলেন, রপ্তানিশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি দিতে ১ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়া হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারিতে বেকার হওয়া ৫০ মিলিয়নের বেশি মানুষকে সরাসরি নগদ এবং অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বনেতাদের মধ্যে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়-ইন, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপাকসে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী সাবেক সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চান-ওচা, সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী স্টেফান লফবেন এবং জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস এ অনুষ্ঠানে ভিডিওবার্তা দেন।