করোনা আক্রান্ত উহানের ৫০০ স্বাস্হ্যকর্মীর

করোনা আক্রান্ত উহানের ৫০০ স্বাস্হ্যকর্মীর।

করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল উহানে অন্তত ৫০০ স্বাস্থ্যকর্মী এতে আক্রান্ত হয়েছে। ভাইরাসে ৩ স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। উহানের বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সূত্রের বরাতে বুধবার এ খবর জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, উহানের একটি প্রথম সারির হাসপাতাল স্বাস্থ্যকর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার খবরসহ বিদ্যমান পরিস্থিতির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে শেইহে, রেনমিন ও ঝংনান হাসপাতালে ১৫০ জন আক্রান্ত রয়েছে।

উহানের এক ডাক্তার জানিয়েছেন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব এবং নতুন ভাইরাস বিষয়ে তথ্যের অভাবে স্বাস্থ্যকর্মীরা নিজেরাও আক্রান্ত হচ্ছে।

নিহত ৩ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে লি ওয়েনলিয়াং নামে এক ডাক্তার রয়েছে। তিনি মারা যাওয়ার পর অধিকাংশ গণমাধ্য খুব গুরুত্বের সাথে তার মৃত্যুর খবর তুলে ধরে। তিনি প্রথম ডাক্তার, যিনি এই ভাইরাসের ভয়াবহতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম আলোচনা করেন। পরে পুলিশ তাকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে নিয়ে যায়। এর এক সপ্তাহ পরেই তিনি মারা যান।

এদিকে, করোনা ভাইরাসে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ১১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। চীনের বাইরে হংকং ও ফিলিপাইনে ১ জন করে মোট ১ হাজার ১১৫ জন নিহত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এতে ৯৭ জন নিহত হয়েছে। তবে গতকাল থেকে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা কমে এসেছে। গতকাল মারা গিয়েছিল ১০৮ জন।

এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৪ হাজার ৬৫৩ জন এবং চীনের বাইরে ৫১৫ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ১৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৭৪৪ জন। এর আরও ৪ হাজার ৭৭১ জন সুস্থ হয়েছে। বুধবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছে। খবর সাউথ চায়না মর্নি পোস্ট। এএফপি।

বুধবার সকালে চায়নার জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, চীনে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ১৫ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৪৪ হাজার ৬৫৩ জন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ জনের অবস্থা ভয়াবহ বলে জানানো হয়েছে। পর্যবেক্ষণে রয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ।

চীনে মঙ্গলবার (১১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত করোনা ভাইরাস আক্রান্ত ৪ হাজার ৭৭১ জন সুস্থ হয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর তাদেরকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ৪ হজার ৭৭১ জন মানুষ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র পেয়েছে। শুধু গতকালই সুস্থ হয়েছে ৭৪৪ জন।

হুবেই প্রদেশের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হুবেইতে নতুন করে ১ হাজার ৬৩৮ জন আক্রান্তের খবর নিশ্চিত করেছে। এ নিয়ে প্রদেশটিতে নিহত হয়েছে ১ হাজার ৬৮ জন, আক্রান্ত হয়েছে ৩৩ হাজার ৩৬৬ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৯৭ জনের মধ্যে ৯৪ জনই হুবেইতে, বাকি ৩ জন মারা গেছে চীনের অন্যান্য এলাকায়।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১০৪ জন নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে। সেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না। কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে। তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ৫১৫ জন আক্রান্ত শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ। ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে। ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

গুয়াংডং-সহ দেশটির যেসব প্রদেশের বাসিন্দা ৩০ কোটির বেশি সেসব শহরে ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু দেশটির কারখানাগুলোতে দিনে মাত্র ২ কোটি মাস্ক তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলে জানিয়েছেন চীনের শিল্প-প্রতিষ্ঠানবিষয়ক বিভাগের মুখপাত্র তিয়ান ইউলং। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ ইউরোপ, জাপান এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাস্ক আনার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, কাজাখস্তান, হাঙ্গেরিসহ বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশ মেডিকেল সহায়তায় হাত বাড়িয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ২০টির মতো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

চীন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, হংকং, সিঙ্গাপুর, ভারত, মালয়েশিয়া, নেপাল, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, কম্বোডিয়া, শ্রীলঙ্কা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাইওয়ান ও ইসরায়েলস ২৫টি দেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগীকে শনাক্ত করা হচ্ছে।