উহানে লকডাউন প্রত্যাহারের পর বিয়ের ধুম!

চীনের উহান, যেখান থেকে প্রথমে করোনার উৎপত্তি হয়েছিল। আড়াই মাস পর লকডাউন প্রত্যাহার হয়েছে গতকাল বুধবার। এরপরই শহরটিতে লেগেছে বিয়ের ধুম। লকডাউন প্রত্যাহারের পর মানুষের চলাফেরা শুরু হয়েছে। দেখলে বোঝার উপায় নেই কয়েকদিন আগেও শহরটি মৃত্যুপুরী ছিল।

গত বছরের শেষে উহানে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা। আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১৫ লাখ। আক্রান্তদের মধ্যে ৮৮ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। এদিকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানারকম বিধিনিষেধ প্রত্যাহার হওয়ায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে মানুষ।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, টানা আড়াই মাসের অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হয়েছে উহান। এরপরই যেসব জুটি প্রাণে বেঁচে গেছেন তারা বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে চাইছেন দ্রুত। তাইতো বিয়ের পিঁড়িতে বসে তারা তাদের এই ‘নতুন জীবনকে’ উদযাপন করছেন।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এসব নবদম্পতিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। যেমন গতকাল লকডাউন প্রত্যাহারের পর সেদিনই বিয়ে করেছেন জু লিন। তিনি বলেন, ‘আজ বিশেষ একটি দিন। আমার এবং উহানের জন্য আজ থেকে নতুন এক জীবন শুরু হলো।’

গত শুক্রবার থেকে হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহানের সরকারি কর্তৃপক্ষ বিয়ের নিবন্ধন পুনরায় চালু করে। কিন্তু লকডাউন থাকায় বিয়ের কাজটা সারতে পারছিলেন না অনেকে। অবশেষে গতকাল বুধবার লকডাউন প্রত্যাহার হলে অনেকেই বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করতে শুরু করেছেন।

উহানে সরকারি নানা অ্যাপ পরিচালনা করে টেক জায়ান্ট আলিবাবার সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলি পে। তারা জানিয়েছে, উহানে বিবাহ নিবন্ধনের হার ৩০০ গুণ বেড়েছে। অ্যাপে ঢুকতে না পারায় অনেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে অভিযোগও করছেন।

লকডাউনের প্রত্যাহারের পরপরই এমনটা শুরু হওয়ায় ধারণা করা হচ্ছে, চীনজুড়ে এখন বিয়ের ধুম পড়ে যাবে। অনেকে যারা বিয়ের পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন তারা করোনার কবলে পড়ে তা করতে পারেননি। অবশেষে তারা বিয়ের কাজটা সেরে ফেলতে চাইছেন।

করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের মধ্যাঞ্চলীয় প্রদেশ হুবেইয়ের রাজধানী উহান থেকে লকডাউন প্রত্যাহার হয় ৮ এপ্রিল। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ওই শহর থেকেই ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব শুরু হলে গত ২৩ জানুয়ারি পুরো উহান লকডাউন করে দেওয়া হয়।

বুধবার মধ্যরাত থেকে সকল বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। মানুষ এখন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে। চীনের উহান শহর সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। এর আগে রাজধানী উহান বাদে হুবেই প্রদেশে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে কর্তৃপক্ষ।

করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরপরই বেইজিং কর্তৃপক্ষ শহরটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ঘরবন্দি করে রাখে ১ কোটিরও বেশি মানুষকে। পুনরায় চালু হয়েছে সব যোগাযোগ ব্যবস্থা। বাসিন্দারা এখন শহর ছেড়ে যে কোনো স্থানে যেতে পারবেন

এদিকে এখন পর্যন্ত চীনে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৮১ হাজার ৮০২, মারা গেছে ৩ হাজার ৩৩৩ জন।

উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ৩ মাস ছাড়িয়েছে। এখনও নিয়ন্ত্রণের লক্ষণ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। করোনায় বিপর্যস্ত সারাবিশ্ব। গত ২৪ ঘণ্টায় বিশ্বজুড়ে ৬ হাজার ৩৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৪৩৩ জন।

এছাড়া বিশ্বজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৮২ হাজার ৯৫৪ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্ত হয়েছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৯৩৫ জন। এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছে ৩ লাখ ২৯ হাজার ৭৩১ জন।

সবমিলিয়ে, বর্তমানে ১০ লাখ ৯৫ হাজার ৭৭১ জন আক্রান্ত রয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ লাখ ৪৭ হাজার ৬৯৩ জন চিকিৎসাধীন, যাদের অবস্থা স্থিতিশীল। আর ৪৮ হাজার ৭৮ জনের অবস্থা গুরুতর, যাদের অধিকাংশই আইসিউতে রয়েছে।

ভাইরাসটি চীন থেকে ছড়ালেও বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যুক্তরাষ্ট্রে। দেশটিতে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৬২ জন আক্রান্ত হয়েছে। আর মৃত্যু হয়েছে ১৪ হাজার ৭৭৪ জনের। ইতালিতে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪২২ জন আক্রান্ত, বিপরীতে মারা গেছে ১৭ হাজার ৬৬৯ জন। এখন পর্যন্ত করোনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ইতালিতে এবং আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রে।

এছাড়া স্পেনে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৮ হাজার ২২০ জন আক্রান্ত, আর ১৪ হাজার ৭৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানিতে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৯৬ জন আক্রান্ত, ২ হাজার ৩৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চীনে আক্রান্ত ৮১ হাজার ৮০২, মারা গেছে ৩ হাজার ৩৩৩ জন। ফ্রান্সে আক্রান্ত ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫০, মারা গেছে ১০ হাজার ৮৬৯ জন। ইরানে আক্রান্ত ৬৪ হাজার ৫৮৬, মারা গেছে ৩ হাজার ৯৯৩ জন। যুক্তরাজ্যে আক্রান্ত ৬০ হাজার ৭৩৩, মারা গেছে ৭ হাজার ৯৭ জন। বেলজিয়ামে আক্রান্ত ২৩ হাজার ৪০৩, মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ২৪০ জনের। নেদারল্যান্ডে আক্রান্ত ২০ হাজার ৫৪৯, মারা গেছে ২ হাজার ২৪৮ জন।

এছাড়া ভারতে এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৯১৬ জন আক্রান্ত হয়েছে। আর প্রাণ গেছে ১৭৮ জনের। পাকিস্তানে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ২৬৩ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৬১ জন মারা গেছে। বাংলাদেশে এ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ২১৮ জন আক্রান্ত হয়েছে বিপরীতে প্রাণ গেছে ২০ জনের।

এ রোগের কোনো উপসর্গ যেমন জ্বর, গলা ব্যথা, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট, শ্বাসকষ্টের সঙ্গে কাশি দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। জনবহুল স্থানে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। বাড়িঘর পরিষ্কার রাখতে হবে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরে এবং খাবার আগে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। খাবার ভালোভাবে সিদ্ধ করে খেতে হবে।