আগস্ট মাসে বিশ্বের সেরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজার

আগস্ট মাসে বিশ্বজুড়ে চমক দেখালেআ দেশের পুঁজিবাজার। চলতি বছর আগস্টে বিশ্বের সেরা পুঁজিবাজারগুলোকে পেছনে ফেলে ভালেআ করেছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। সূচক বৃদ্ধিতে নাম্বার ওয়ান হয়েছে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার। এ সময় দেশের পুঁজিবাজারে সূচক বেড়েছে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে করে আগস্টে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বিশ্বের সেরা পারফর্মিং বাজার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইপিএল ও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনেও এ তথ্য উঠে এসেছে।

মূলত গত মে মাসে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে পুনর্গঠিত কমিশন কাজ শুরু করে। কাজ শুরুর পর থেকে পুঁজিবাজার বান্ধব অনেক উদ্যোগ বাস্তাবয়ন করেছে কমিশন। বিএসইসির ইতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণে ঘুড়ে দাঁড়াতে শুরু করে পুঁজিবাজার। নতুন আশায় প্রাণ ফিরেছে ঝিমানো পুঁজিবাজারে। কমিশনের নানামুখী পদক্ষেপে গত তিন মাস ধরে চাঙ্গাভাব রয়েছে পুঁজিবাজারে। এ সময়ে সুদের নিম্নমুখী হারও বাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। ফলে স্থানীয় বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণে লেনদেন হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

ব্র্যাক ইপিএল ও এএফসি এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, সুদের নিম্নহার, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক কার্যক্রম আবারও শুরু হওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই)। এ বিষয়গুলোয় ভর করেই গত মাসে বেড়েছে ডিএসইর সূচক।

চলতি বছরের জুন থেকে ডিএসই প্রধান মূল্যসূচকটি বেড়েছে ৯৬৩ পয়েন্ট বা ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঙ্গাভাব দেখা গেছে আগস্টে। এ সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৬৬৭ পয়েন্ট বা ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়ে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গে নতুন কমিশনের কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরেছে বাজারে। এ সময়ে তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকদের সম্মিলিতভাবে ন্যূনতম ৩০ শতাংশ শেয়ারধারণে বাধ্যবাধকতা আরোপ, নিজ কোম্পানিতে দুই শতাংশের কম শেয়ারধারী পরিচালকদের পদ শূন্য করতে সময় বেঁধে দেওয়ার পাশাপাশি দুর্বল মৌলভিত্তির ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো পুনর্গঠনে বড় আকারের সংস্কারে শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম কমিশনের উদ্যোগ বাজারে চাঙ্গাভাব ফেরাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

আগস্টে বিশ্বের সেরা পারফর্মিং বাজারের চিহ্নিত হওয়ার বিষয়ে বিএসইসির চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম বলেন, ‘ জনবল সংকট আছে বিএসইসিতে। আমরা কম জনবল নিয়ে প্রচুর কাজ করছি। আশা করি এমন একটি ভালো খবর আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেবে। তাতে সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও শক্তি-সামর্থ্য নিয়ে কাজ করতে পারব। এ সাফল্য আমাদের টিমওয়ার্কের ফসল। পুঁজিবাজারের এমন অবস্থানের কারণে আমাদের টিমওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের অর্থনীতি অনেক এগিয়ে যাবে। ’

ব্র্যাক ইপিএল ও এএফসি এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, লকডাউন-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর গত মাসে বিশ্ব পুঁজিবাজারে টপ পারফর্মিং মার্কেটের শীর্ষে জায়গা করে নেয় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রড ইনডেক্স। এ মাসে সূচক বাড়ে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। তদুপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সুদের হার কমানোর পদক্ষেপে ইক্যুইটি বাজারে ফিরছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা। এর সঙ্গে এ পদক্ষেপে বেড়েছে তারল্য।

আগস্টে টপ পারফর্মিং মার্কেটের তালিকায় বাংলাদেশের পরের অবস্থান ভিয়েতনামের। এ সময় দেশটির পুঁজিবাজারে সূচক বেড়েছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। দুর্বল অবস্থানে ছিল কম্বোডিয়া ও লাওসের পুঁজিবাজার।

আগস্টে টপ পারফর্মিং পোর্টফোলিও স্টক ছিল বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু পর্যন্ত পুঁজিবাজার টানা দরপতনে ছিল। এ সময়ে ডিএসইর প্রধান সূচকটি ৪২ শতাংশ হারিয়ে ৬২৫৪ পয়েন্ট থেকে চলতি বছরের ১৮ মার্চ ৩৬০৩ পয়েন্টে নেমে আসে। পরবর্তীকালে শিবলী রুবাইয়াতের নেতৃত্বে কমিশন কাজ শুরুর পর পুঁজিবাজার পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকও পুঁজিবাজারের সহায়তায় এগিয়ে আসে।

গত আগস্টে ডিএসইর সূচক বাড়াতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক, এনবিএফআই, টেলিযোগাযোগ, ফার্মাসিউটিক্যালস, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, বিবিধ, বস্ত্র ও প্রকৌশল খাত। ফ্রি-ফ্লোট (লেনদেনযোগ্য) শেয়ারের ভিত্তিতে ডিএসইর সূচক গণনা করা হয়। যেহেতু ব্যাংকের ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার বেশি, সে কারণে সূচকে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে ব্যাংক খাত। গত আগস্টে ব্যাংকের বাজার মূলধন বেড়েছে ১৬ শতাংশ। এ সময়ে এনবিএফআই খাতের দর বেড়েছে প্রায় ২৯ শতাংশ। এছাড়া টেলিযোগাযোগ ২৩ শতাংশ, বিবিধ ২২ শতাংশ ও ফার্মাসিউটক্যালস খাতের বাজার মূলধন ১৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

বছরের পর বছর ধরে লোকসানি, লভ্যাংশ না দেওয়া জেড ক্যাটাগরি কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনে শিবলী রুবাইয়াতের কমিশনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়। আদেশ জারি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া জেড গ্রুপে থাকা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও বর্তমান পরিচালকরা তাদের ধারণ করা শেয়ার বিক্রয়, ক্রয়, হস্তান্তর এবং প্লেজ নিষিদ্ধ করা হয়। ‘জেড’ গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানিগুলোকে ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে চলমান বোর্ড পুনর্গঠন করতে বলা হয়। এর ব্যর্থতায় বর্তমান পরিচালক ও উদ্যোক্তারা অন্য কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী কোনো কোম্পানির পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন না। বিশেষ নিরীক্ষক ও কমিশন কর্তৃক পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন করে ‘জেড’ গ্রুপে কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিতেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। বার্ষিক সাধারণ সভা নিশ্চিতের পাশাপাশি সব ধরনের শেয়ারহোল্ডার মিটিং ই-ভোটিং সুবিধায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। নানামুখী চাপের মধ্যেও ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখে কমিশন। নতুন কমিশনের এমন সব পদক্ষেপের কারণেই বাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে আসে। এ সময়ে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রির পরিমাণও কমে যায়। এছাড়া সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও নীতিগত সহায়তা দেওয়া হয় পুঁজিবাজারকে।

ব্র্যাক ইপিএল ও এএফসি এশিয়া ফ্রন্টিয়ার ফান্ডের প্রতিবেদনে ভিয়েতনামে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ খানিকটা দুর্বল হওয়ার পর অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশটির পুঁজিবাজারে। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাজারে সূচক বেড়েছে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ আগ্রহের কারণে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এশিয়ার পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলে নিলেও বিনিয়োগ করছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা। এতে চলতি বছর মার্চ থেকেই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় আছে এশিয়ান ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলো। সুদের নিম্নহার ও ডিসকাউন্টেড ভ্যালুয়েশনে আকৃষ্ট হয়ে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করছেন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা, যখন একই কারণে বিদেশিরা নিট শেয়ার বিক্রি করছেন।

এদিকে গত এক মাসে বাংলাদেশের মতো ফ্রন্টিয়ার মার্কেটগুলোতে বড় ধরনের চাঙ্গাভাব দেখা গেলেও বিশ্বের বড় পুঁজিবাজারগুলোতে তেমনটি দেখা যায়নি। গত এক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ডাউজোনস সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ সময়ে নাসডাক সূচক ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে যুক্তরাজ্যের এফটিএসই ১০০ সূচক উল্টো কমেছে। একই সময়ে জাপানের নিক্কেই সূচক ১ দশমিক ২৪ শতাংশ বাড়লেও চীনের সাংহাই সূচক ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। গত এক মাসে ভারতের সেনসেক্স সূচক কোনো রকমে ইতিবাচকতা ধরে রেখেছে। যদিও সর্বশেষ প্রান্তিকে দেশটির জিডিপি প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমে গেছে।

গত ১২ মাসে বিশ্বে শীর্ষ পুঁজিবাজারের তালিকায় চতুর্থ স্থান ধরে রেখেছে পাকিস্তান। চলতি হিসাব ঘাটতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো স্থিতিশীল থাকায় মহামারী পূর্ববর্তী সময়েই পাকিস্তানের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমনকি মহামারী-পরবর্তী সময়ে সুদের নিম্নহার, করোনা আক্রান্তের সংখ্যার অবনমন এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুদ্ধার ও রপ্তানি বৃদ্ধিতে এশিয়া অঞ্চলের অনেক দেশকেই পেছনে ফেলেছে পাকিস্তান। করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের পিই রেশিও এখনো সাড়ে ৭ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি রপ্তানি পুনরুদ্ধার হয়েছে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাতেও। মহামারীর সময় ভিয়েতনাম পণ্য রপ্তানিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হলেও পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। বিশেষ করে এপ্রিলে। এ সময় করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে এ দেশগুলোর পাশাপাশি লকডাউন চলছিল গোটা বিশ্বের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের মতো প্রধান বাজারগুলোয় এসব দেশের রপ্তানি কমে যায় উল্লেখযোগ্য হারে। এরপর বিশ্ব্যাবপী লকডাউন তুলে নেওয়া হলে এ তিন দেশের রপ্তানির পরিমাণ বাড়তে শুরু করে। গত আগস্ট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৩২ শতাংশ।